গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি বা সারফেস ওয়াটার (নদী, খাল, জলাশয় ইত্যাদি) ক্রমেই কমে যাচ্ছে।তবে শহরে এই হ্রাস অনেক বেশি, গ্রামে তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণ হিসেবে, ‘রশিদ ও অন্যান্য’ (২০২৩)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৪.৩ বর্গকিলোমিটার হারে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি বা সারফেস ওয়াটার কমেছে।
জাতিসংঘ ও পরিবেশ সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৪.৯২ বিলিয়ন ঘনমিটার অতিরিক্ত সুপেয় পানির প্রয়োজন হবে, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে কৃষি খাতে একটি বড় অংশ থাকবে এবং শিল্প খাতে পানির চাহিদা ৩৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে টিউবওয়েলই সুপেয় পানির প্রধান উৎস। তথ্য অনুযায়ী, রংপুরে ৯৪.৬ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৯৩.৪ শতাংশ, বরিশালে ৯২.৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৯১.২ শতাংশ এবং খুলনায় ৯০.১ শতাংশ মানুষ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে। অন্যদিকে ঢাকায় ট্যাপ/পাইপের পানির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি (১৯.৫ শতাংশ)। বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহীতে ট্যাপ/পাইপের ব্যবহার কম, মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। পুকুর বা নদী থেকে সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করে চট্টগ্রামে, ২.৪ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে পানি ব্যবহারের হারও খুবই কম (০.৫ থেকে ১.২ শতাংশ)।
গ্রামীণ এলাকায় টিউবওয়েলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং শহর ও নগরে দূষিত পানির উৎসগুলো এই সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। তবে স্যানিটেশনের দিক থেকে বাংলাদেশে উন্নত স্যানিটেশন সুবিধার কাভারেজ প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। কিন্তু গুণগত মানের ফাঁকের কারণে দূষণ বাড়ছে (এসডিজি ৬.২.১ অনুসারে নিরাপদ স্যানিটেশন ৩১ শতাংশ জনসংখ্যা ব্যবহার করে)।
অঞ্চলভিত্তিক পানির সংকটও উল্লেখযোগ্য। বরেন্দ্র অঞ্চলে (রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ) শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে এক থেকে তিন মিটার নেমে যাচ্ছে, যা ‘উল্যাহ ও আহমেদ’ ২০২৫-এর গবেষণায় নিশ্চিত। গভীর নলকূপের অতিরিক্ত ব্যবহার কৃষি এবং জীবন-জীবিকা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে।
গত ৩০ বছরে (১৯৯০-২০২০) বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও ভোলায় লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গর্ভবতী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পশিয়া ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করছে। খুলনা-সাতক্ষীরায় লবণাক্ততা সবচেয়ে তীব্র, যেখানে ২০০০-২০২০ সালে মাটি ও পানির লবণাক্ততা ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে, যা ফসলের উৎপাদন ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে (বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) ঝরনা ও ছোট নদীগুলো হচ্ছে প্রধান পানির উৎস, কিন্তু বন উজাড় ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে বর্ষায় পানির গুণমান কমে যাচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।
শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য নদী ও খালকে দূষিত করছে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (DO) মাত্রা এত কম যে জলজ প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন এবং আর্সেনিক দূষণও তীব্র। বুড়িগঙ্গা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে (যেমন—এপ্রিল ২০২২) DO-এর মাত্রা ০.১ মিলিগ্রাম/লিটার পর্যন্ত নেমে গেছে, যা জীবনের জন্য মারাত্মক কম (সাধারণত ৫ মিলিগ্রাম/লিটারের নিচে স্ট্রেস সৃষ্টি করে এবং ১-২ মিলিগ্রাম/লিটারের নিচে মাছের মৃত্যু ঘটায়)। একই রকম চিত্র শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদে বিরাজমান। ফলে জলজ ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
সুপেয় পানিসংকটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম। সিএমআইপি৬ (CMIP6) জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তাপমাত্রা 0°C থেকে 0.0°C বৃদ্ধি পাবে। বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টি বন্যার ঝুঁকি বাড়াবে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি তীব্র হবে। এই পরিবর্তন পানির প্রাপ্যতা ও গুণমানকে আরো হ্রাস করবে। এ ধরনের সংকট মোকাবেলায় ১৯৯৯ সালের জাতীয় পানি নীতি, ২০০১ সালের জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, ২০১৩ সালের পানি আইন এবং ২০১৮ সালের পানি বিধিমালার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা (IWRM) নির্দেশিকা আধুনিক পদ্ধতিতে পানি ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করেছে। এই উদ্যোগগুলো এসডিজি ৬ (নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন) এবং এসডিজি ২, ১১, ১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের অগ্রগতি অনুসারে, নিরাপদ পানির কাভারেজ ৫৯ শতাংশ (এসডিজি ৬.১.১), যা ২০৩০ সালের ১০০ শতাংশ লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে।
অতএব সুপেয় পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ভূগর্ভস্থ, ভূপৃষ্ঠের এবং বৃষ্টির পানি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হবে। রিয়াল টাইম ডাটা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা প্রতিরোধে ডিস্যালিনেশন, রিভার্স অসমোসিস এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে হবে।
শিল্প ও কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর নীতি; যেমন—‘দূষণকারীকেই মূল্য দিতে হবে’ নীতি কার্যকর করতে হবে। আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টনে সমস্যা সমাধানে শক্তিশালী কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে এবং প্রয়োজনে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালতের সাহায্য নিতে হবে। এ ছাড়া ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মাধ্যমে নদী পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি আধুনিকায়ন এবং উপকূলীয় সুরক্ষার মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। বড় নগরগুলোতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পার্ক ও খেলার মাঠে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বিবেচিত হবে।
এ ধরনের সমস্যা সমাধানে পরবর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বিএনপির মতো বড় দল ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে তাদের এ সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার এজেন্ডায় সুপেয় পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থানীয় শাসন সংস্কারের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণ, নারীদের সম্পৃক্ততা এবং WARPO-এর ডেটা বেইস জনমুখী করে সুপেয় পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ নিরাপদ পানির লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি, পদক্ষেপ ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।