চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়ারলুং জাংবো নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে, যা ভারত ও বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। এই মেগাবাঁধটি দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বতের নিয়িংচিতে অবস্থিত পাঁচটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ক্যাসকেড নিয়ে গঠিত হবে এবং এটি ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে, যা বাংলাদেশের বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় তিন গুণ।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০৩৩ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়াবে ১৬৭ বিলিয়ন ডলারে এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে। প্রকল্পটি চীনের বৃহত্তর বিদ্যুৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা তার পশ্চিম থেকে পূর্ব বিদ্যুৎ স্থানান্তর প্রকল্পের অংশ। প্রকল্পটির লক্ষ্য তিব্বতে কার্বন নিরপেক্ষতা এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক উন্নয়ন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং প্রকৌশল মহলে প্রকল্পটির কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অনন্য ভূপ্রকৃতিগত সুবিধা এবং প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জের ওপর জোর দেয়। তবে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার নথি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিসরে প্রচারিত হয়নি বা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। বস্তুত চীনা প্রকল্পগুলোর নথি পাওয়া সহজও নয়। আমরা দেখেছি, অতীতে এ ধরনের বাঁধ নির্মাণের জন্য একটি বিস্তৃত, প্রকল্প-নির্দিষ্ট পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) প্রকাশ করা হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। ঐতিহাসিকভাবেই চীনের বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের জন্য, আন্তঃসীমান্ত নদী প্রকল্পের জন্য ইআইএ নথি খুব কমই প্রকাশ করা হয়। অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন অধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থা উভয়ই বৃহত্তর স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ইআইএ বা বিস্তারিত নথিপত্র প্রকাশ করা হয়নি।
আমরা জানি, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার-সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনভেনশনের (১৯৯৭) মতো আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে চীন একতরফা ভারত ও বাংলাদেশের ভাটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত নদীর ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। তবে এই যৌথ নদীর দেশগুলোর কেউই আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসংঘের কনভেনশন (১৯৯৭) গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ যদিও কনভেনশনটির পক্ষে ভোট দিয়েছিল, এখনও জাতীয় সংসদে বা সরকারের মন্ত্রিসভায় সেটা রেটিফাই বা অনুস্বাক্ষর করেনি। এই দেশগুলোর মধ্যে প্রবাহ তথ্য ভাগাভাগি করার জন্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত রয়েছে দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী। এর বাইরে আরও বেশিসংখ্যক অস্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। এর মধ্যে কেবল গঙ্গা নদীর প্রবাহ ভাগাভাগি করার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি একটি অকার্যকর চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির মেয়াদও ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই তাদের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর চীনা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশ ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লাউলি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই নদীগুলোর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে ভারতের অর্থনীতিকে দম বন্ধ করে দিতে সক্ষম।’ ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, চীন এটিকে এক ধরনের ‘জলবোমা’ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। উপরিউক্ত উদ্বেগগুলোর বৈধতা রয়েছে। তবে বিড়ম্বনা হলো এই, ভারতের দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপরেও একইভাবে দম বন্ধকারী প্রভাব ফেলছে। ঠিক যেমন ভারত এখন আশঙ্কা করছে, ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর চীনের একতরফা নিয়ন্ত্রণ সম্ভবত তাদের দেশের ওপরেও এ রকম প্রভাব ফেলবে।
আমরা স্বীকার করি, ভারত আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর প্রশ্নে বাংলাদেশের সঙ্গে যা করছে তা ইয়ারলুং জাংবো নদীর ওপর চীনের প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ন্যায্যতা দেয় না। বাংলাদেশের উচিত এ প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করা। প্রয়োজনে বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে একটি অংশীদারিত্ব গঠন করা, যাতে চীন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে এ উদ্বেগ উত্থাপন করা যায়।
ভারত ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চীনকে আন্তঃসীমান্ত নদীতে কোনো প্রতিকূল প্রভাব না ফেলার আহ্বান জানিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ভারত পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অরুণাচল প্রদেশে নিজস্ব বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। এ ধরনের পাল্টা বাঁধ বাংলাদেশের ভাটির দিকে পানি প্রবাহ সংকট নিঃসন্দেহে আরও বাড়িয়ে তুলবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছ থেকে প্রকল্পের বিস্তারিত এবং ভাটির দিকে প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য অনুরোধ করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বাঁধটি ভাটির দিকে পানি প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে না। দেশটি আরও যুক্তি দিয়েছে, এর সুবিধা মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকবে। তারা ‘পরিবেশগত সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ মনোযোগ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। যদিও এখনও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তঃদেশীয় পরামর্শের ব্যবস্থা বা বিস্তারিত জানানোর ব্যবস্থা করেনি।
ইয়ারলুং জাংবো বা সিয়াং-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর জলধারার সবচেয়ে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ভারত, চীনসহ উজানের যে কোনো দেশের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর একতরফা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। ইয়ারলুং জাংবো নদীর ওপর বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের পরিবেশগত উদ্বেগ ব্যাপক। এটা বাংলাদেশসহ ভাটির দেশগুলোর জন্য বহুস্তরীয় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে। এমনকি ভাটির দেশগুলোতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি করবে। প্রকল্পটি ভূতাত্ত্বিকভাবে নাজুক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মুখে ব-দ্বীপ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করবে।
বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর মধ্য দিয়ে শুকনো মৌসুমে উজান থেকে আসা পানির প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবাহ পায়। এই প্রবাহে যে কোনো অনিশ্চয়তা ও ব্যাঘাত কৃষি, সেচ, মৎস্য, নৌ চলাচল ও মৎস্য উৎপাদনে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলবে। হঠাৎ (ইচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাক্রমে) বেশি পরিমাণে পানি ছাড়ার ঝুঁকি, যা অরুণাচল প্রদেশ, আসাম ও ভাটির বাংলাদেশে গুরুতর বন্যার হুমকি তৈরি করবে। যে কোনো ‘নদীর প্রবাহ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যবস্থার ধরন পরিবর্তন করে এবং ভাটির প্রবাহ তীব্র হয়ে ওঠে। যার ফলে বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ ব্যাহত হয়।
বিপদ আরও আছে। বৃহৎ বাঁধগুলো সাধারণত পলি বা সিল্ট বা তলানি প্রবাহ আটকে রাখে। এর ফলে নদীর তলদেশে অবক্ষয়, মাটির উর্বরতা হ্রাস, স্থানীয় মৎস্য সম্পদের পতন, আঞ্চলিক জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ ও মাহসিরের মতো পরিযায়ী প্রজাতির মৎস্য সম্পদের সংখ্যা হ্রাস করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান স্ফীতি ঠেকিয়ে রাখার জন্য উপকূলীয় সমভূমিতে পলি জমার হার হ্রাস পেতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন বাঁধ বা ড্যামের কারণে মেকং নদীতে পলি প্রবাহ প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যার ফলে কৃষিকাজ ও মৎস্য চাষ হ্রাস পেয়েছে। উজানে বাঁধ দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের গঙ্গা ও তিস্তা নদীতেও পানি ও পলি প্রবাহে একই রকম হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।
ষাটের দশকে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো বার্ষিক দুই বিলিয়ন টনেরও বেশি পলি বাংলাদেশে বহন করত, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রায় এক বিলিয়ন টনে নেমে এসেছে। বাঁধগুলো নিম্নগামী পলি সরবরাহ হ্রাস করে, জলের ক্ষয়কারী শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বাংলাদেশের নদীর তীর এবং ব-দ্বীপ স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক ভূমি নির্মাণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান নদী যেমন ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গঙ্গা, তিস্তা ও মেঘনা নদীর তীরে নদীভাঙনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেক গবেষক জানিয়েছেন।
যদিও কিছু চীনা গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে আরও বেশি পানি ছেড়ে এবং বর্ষাকালে বন্যা আটকে রেখে বাঁধগুলো প্রবাহকে স্থিতিশীল করতে পারে– ভারতীয় পানিসম্পদ কর্মকর্তা ও জলবিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেণ, উজানে নিয়ন্ত্রণ বন্যাকে আরও খারাপ করতে পারে অথবা ইচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাক্রমে পানি ছাড়ার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যা কিংবা খরার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বা জরুরি অবস্থার সময়।
ব্রহ্মপুত্র ভারত ও বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জন্য পানীয়, সেচ ও জলবিদ্যুতের জন্য পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, চীনা বাঁধগুলো ‘ভারতীয় রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর ৮০ শতাংশ শুকিয়ে ফেলতে পারে।’ এর ফলে আঞ্চলিক পানি সরবরাহ এবং কৃষি জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে। হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে ব্যাপক বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর দেশগুলোর মধ্যে পানি বণ্টন চুক্তি বা স্বচ্ছ তথ্যের অভাব ভাটির ব্যবহারকারীদের জন্য এই ঝুঁকিগুলো আরও বাড়িয়ে তোলে।
ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলগত গবেষণার দাবি সত্ত্বেও চীনা বাঁধগুলো নিয়ে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন-ইআইএ সম্পন্ন বা প্রকাশ না করার বিষয়টি ব্রহ্মপুত্রের ভাটির অংশীজন এবং পরিবেশগত পর্যবেক্ষকদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাঁধটি বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, যা কিনা ১৯৫০ সালে ৮.৬ মাত্রার বিধ্বংসী আসাম-তিব্বত ভূমিকম্পস্থলের কাছেই অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প বা ভূমিধস বাঁধের ধ্বংসাত্মক ব্যর্থতা তৈরি করতে পারে। যার ফলে ভাটির প্রান্তে কেবল পরিবেশগত প্রভাবই নয়; মানব বসতি এবং কৃষিজমির ওপরেও প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে চীনের প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ ও প্রযুক্তিগত প্রতিক্রিয়া বহুস্তরীয়, দৃঢ় এবং আন্তর্জাতিক পানি আইন ও আন্তঃসীমান্ত নদী সর্বোত্তম অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বিশ্বব্যাপী নজির এবং এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া থেকে এই লেখক নিম্নলিখিত ১০টি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন:
ক. বিস্তারিত প্রযুক্তিগত নথি প্রকাশের জন্য চীনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত ও সম্প্রসারণ করা, বিশেষ করে ইআইএ, সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন, জলবায়ু প্রভাব মূল্যায়ন এবং দুর্যোগ প্রভাব মূল্যায়ন-সংক্রান্ত নথিপত্র শেয়ারের অনুরোধ করা উচিত।
খ. ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যৌথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার জন্য ভারতসহ ত্রিপক্ষীয় সম্পৃক্ততা সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করা উচিত।
গ. প্রকল্পটি চালু করার আগে সমস্ত অংশীদারের উদ্বেগের সমাধান নিশ্চিত করার জন্য চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, সম্ভবত নেপালসহ একটি অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগের প্রস্তাব বা যোগদান করা উচিত।
ঘ. ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ আইন সংক্রান্ত কনভেনশনের অনুস্বাক্ষর বা অনুমোদন দ্রুত অনুমোদন করা উচিত, যাতে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার জোরালো হয় এবং ন্যায় ও যুক্তিসংগত ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি নিয়মকানুন প্রয়োগ করা যায়।
ঙ. পর্যাপ্ত তথ্য বা প্রশমন নিশ্চিত না হলে আইনি সালিশ বা আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার উল্লেখের বিকল্পগুলো অনুসন্ধান করা উচিত।
চ. আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব স্বাধীনভাবে অধ্যয়ন করার জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
ছ. ন্যায়সংগত ও ন্যায্য আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার পক্ষে সমর্থনকারী আঞ্চলিক ও বহুজাতিক পরিবেশবাদী ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে তোলা উচিত।
জ. ব্রহ্মপুত্র প্রবাহের প্রত্যাশিত পরিবর্তনের জন্য সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নদী বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করার জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা উচিত।
ঝ. ঝুঁকি ও সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম, পানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজকে সক্রিয়ভাবে অবহিত করা উচিত। আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমানতা এবং বাংলাদেশের অবস্থানের জন্য ঐকমত্য বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই।
ঞ. অভ্যন্তরীণ নদীর জন্য সর্বস্তরে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত।