মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) আল্লাহর চির-শাশ্বত বাণী কুরআন মজিদ নিয়ে আবির্ভূত হন আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে। তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন আরবের সর্বস্তরের সত্যাশ্রয়ী মানুষ; নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক ও কিশোর শ্রেণী। মক্কার কুরাইশদের চরম অত্যাচার-নিপীড়ন মাথায় নিয়ে যারা মহানবীর পয়গাম বুকে ধারণ করতে এগিয়ে আসেন তারা সবাই ছিলেন যৌবনদীপ্ত। আবু বকর (রা) এর মতো লোকেরা চল্লিশোর্ধ হলেও তাদের অন্তর ছিল তারুণ্যে উদ্দীপিত, মনোবল ছিল লড়াকু, যৌবনের বসন্তের শিহরণ ছিল সর্বাঙ্গে।
আফ্রিকান তরুণ কৃতদাস হযরত বেলাল (রা.) এর উপর যে লোমহর্ষক নিপীড়ন চালানো হয়েছিল তার উপমা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। প্রশ্ন জাগতে পারে, ইসলাম পালন, প্রচার ও প্রতিষ্ঠার পেছনে এত নিপীড়ন কেন সহ্য করতে হলো? আল্লাহ পাক নিজেও কেন এসব সহ্য করলেন। এর পেছনে হিকমত ছিল, এ কথা শিখিয়ে দেয়া যে, যুগে যুগে মুসলমানদের অগ্নিপরীক্ষা দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, যত নির্যাতন-নিপীড়ন-বাধা আসুক ইসলামের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। বরং ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হেয় হার কারবালা কে বাদ’। ইসলামের ইতিহাসের শুরুতে এমন অবর্ণনীয় নির্যাতন ও ত্যাগের মহিমা ছিল বলেই ফিলিস্তিনে গাজায় মুসলমানরা এখনো বুক চিতিয়ে তাদের গৌরবদীপ্ত আস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। ইনশাআল্লাহ তরবারীর উপর রক্তের প্রাবল্য, জালিমের উপর মজলুমের বিজয় এবং মিথ্যার উপর সত্যের জয় একদিন আসবেই।ইসলামের এই ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, ইসলামকে এগিয়ে নিতে হলে, খাঁটি মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হলে অবশ্যই তারুণ্যদীপ্ত অন্তকরণের অধিকারী হতে হবে। ইসলামের ঝা-া বহনের জন্য তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। নবীজি (সা.) যে এ ধরনের প্রত্যাশা পোষণ করতেন তার প্রমাণ বিদ্যমান হাদীসের পরতে পরতে। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ‘কাল কিয়ামতের দিন যখন কোথাও কোনো ছায়ার চিহ্ন থাকবে না, সূর্য মাথার উপর এসে আগুন ঝরাবে তখন আল্লাহর আরশের নিচে যারা ছায়া পাবে তাদের একটি শ্রেণি হলো, ‘ওয়া শাব্বুন নাশা ফী ইবদতিল্লাহ’Ñ এমন তরুণ যার যৌবন অতিবাহিত হয়েছে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে।শিশু-কিশোরদের প্রতি মহানবী (সা.) এর আদর ¯েœহ মমতার বর্ণনায় ইতিহাস আলোকিত। এই ¯েœহমমতার পেছনে যে বৃহত্তর লক্ষ্য লুক্কায়িত তার প্রমাণ পাওয়া যায়, ইতিহাসের আরেকটি ঘটনায়।
মক্কায় একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি নবীজির উপর আগুনের গোলার মতো উড়ে আসছিল। চরম বিপদে ধৈর্যের ছায়া, আশ্রয়ের ঠিকানা ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী আম্মাজান খাদিজাতুল কুবরা (রা.)। মক্কার কুরাইশদের মারমুখো শত্রুতার সামনে ঢালের মতো ছিলেন চাচা আবু তালেব। উভয়ের ইন্তিকালের পর দুর্দিনের ঘনঘটা নেমে আসে নবীজির জীবনে। ভাগ্য ফিরানোর চেষ্টায় আশাবাদী মনে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তিনি চলে যান মক্কার বাইরে তায়েফে। কিন্তু সেখানকার প্রধান তিন সর্দার নবীজিকে অপমানিত করে তাড়িয়ে দেয়। এমনকি নবীজির পেছনে দুষ্টু লোকদের লেলিয়ে দেয়। তাদের পাথর বৃষ্টিতে ঝাঁঝরা, রক্তাক্ত হয় নবীজির শরীর ও পা মোবারক। ক্লান্ত শ্রান্ত অবস্থায় আশ্রয় নেন একটি বাগানে। আমরা যেন না ভাবি যে, আল্লাহ পাক নবীজিকে কেন এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ছেড়ে দিলেন। ইসলাম পালন, লালন ও ধারণ করতে হলে কী কী পরীক্ষা দিতে হয়েছে তা ভবিষ্যতের মুসলমানদের বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ছিল আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত অনুশীলন।চলৎশক্তিহীন নবীজি একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন। ফেরেশতা জিব্রাঈল এলেন আল্লাহর পক্ষ হতে একটি বার্তা নিয়ে। হে নবী আপনি অনুমতি দিন, দুইপাশের দুটি পাহাড় আমার পাঞ্জায় নিয়ে এই জনপদের মানুষগুলোর মাথার উপর চাপা দিতে চাই। চোখের পলকে নবী নিপীড়ক এই জনপদ আগেকার অভিশপ্ত জাতিসমূহের মতো ধ্বংস ও নিপাত হয়ে যাক। নবীজির একটুখানি সম্মতি সেদিন তায়েফের অবাধ্য জনগণ নাস্তানাবুদ হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু না। তিনি জিব্রাঈলের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, এরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে ঠিক। কিন্তু আমি আশাবাদী তাদের অনাগত সন্তানরা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলাম গ্রহণ করবে, ইসলামের ঝা-া বহন করে এগিয়ে যাবে। কাফেরের ঘরের সন্তানদের ব্যাপারেও নবীজির এই আশাবাদ শিশু-কিশোর-তরুণদের নিয়ে এক স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ রচনার ভিত্তিমূল, যে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার দায়িত্ব যুগে যুগে উম্মতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের উপর অর্পিত।আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদীরা, নাস্তিকরা দেশটাকে ইসলামশূন্য করার পরিকল্পনা করেছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় হিন্দুয়ানী নাস্তিকতা ও সংস্কৃতির নামে উলঙ্গপনার বিস্তার ঘটিয়ে। অভিভাবকরা শংকিত হয়ে পড়েছিল, এই প্রজন্মকে বুঝি সত্য-সুন্দর ও ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৫ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, না, আমাদের সন্তানরা যে কোনো সময় ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। স্বৈরাচারের জগদ্দল পাথর জাতির বুকের উপর থেকে তুলে দিল্লিতে নিক্ষেপ করার অমিত শক্তি তাদের বাহুতে আছে। তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি নবীজির আশাবাদকে বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে মিলালে আমাদের মধ্যেও আশাবাদ জন্ম নেয়।নবীজির শেষ জীবনের একটি ঘটনা সামনে আনলে এক কথায় স্বীকার করতে হবে, নবীজি (সা). তরুণদের হাতেই ইসলামের ঝা-া তুলে দিয়ে দুনিয়া হতে বিদায় হয়েছেন।
১০ম হিজরীতে বিদায় হজ্বের পর নবীজি সবেমাত্র মদীনায় ফিরে এসেছেন। বিশ্রাম না নিতেই হুকুম দিলেন একটি বাহিনী প্রেরণ করা হবে সিরিয়ায় রোমান স¤্রাটের বিরুদ্ধে। কারণ, তারা মুসলমানদের উপর নানাভাবে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। তখনকার দিনে বর্তমানের মতো নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিল না। কোনো অভিযান পরিচালনা করতে হলে সেনাপতির নাম ঘোষণা হতো, তারপর স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারা জড়ো হতো। নবীজি নির্দেশ দিলেন মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুহাজির ও মদীনার আনসারদের মধ্যকার শীর্ষ ব্যক্তিদের যোগ দিতে হবে এই অভিযানে। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), উমর ফারুক (রা.), আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.), সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের (রা.) মতো অধিনায়কদের যেতে হবে সিরিয়া অভিযানে। অভিযানের অধিনায়ক নিযুক্ত হলেন উসামা ইবনে যায়দ। বয়স মাত্র ১৮ বছর বা তার চেয়ে কিছু বেশি। কথা উঠল, এত অল্প বয়সের একটা যুবকের অধীনে মদীনা রাষ্ট্রের গণ্যমান্য লোকেরা যুদ্ধে যাবে। নবীজি সেই কথার কড়া সমালোচনা করে জবাব দিলেন। ‘আজ যদি তোমরা উসামার ব্যাপারে আপত্তি জানাও, এটা নতুন নয়, এ ধরনের সমালোচনা তোমরা তাবুক যুদ্ধে যখন তার পিতা যায়দকে অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়েছিল তখনও করেছিলে। আল্লাহর কসম, উসামার মধ্যে অধিনায়কত্বের যোগ্যতা আছে।’
মদীনা হতে ১৪ মাইল দূরে সেনা ছাউনিতে যোদ্ধারা জড়ো হচ্ছিল। এরইমধ্যে খবর আসে নবীজি অসুস্থ। দিনদিন বাড়ছে রোগ। উসামা (রা.) নবীজিকে দেখতে মদীনায় গেলেন। আশা ছিল, তিনি অভিযানের তারিখ পিছিয়ে দেবেন। সাক্ষাতে নবীজি (রা.) বরং তাড়াতাড়ি রওনা হওয়ার জন্য তাগাদা দিলেন। সাহাবায়েকেরাম উদ্বিগ্ন। নবীজির স্বাস্থ্যের আরো অবনতি হয় কিনা। তারা উম্মে আয়মানের সাহায্য চাইলেন। তিনি উসামার মা। তবে নবীজির আম্মাজান মারা যাওয়ার পর থেকে নবীজিকে মায়ের ¯েœহে আগলে রেখেছিলেন মক্কায় কুড়িয়ে পাওয়া এই আফ্রিকান কৃতদাসী। নবীজির প্রস্তাবে হযরত যায়দ ইবনে হারেসা তাকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে উসামার জন্ম। নবীজি মায়ের মতো ভক্তি করেন উম্মে আয়মানকে। তিনি নবীজির কাছে এসে অভিযানের তারিখ কদিন পিছিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে ব্যর্থ হন। এরইমধ্যে ১৪ দিনের মাথায় প্রিয়নবী তার পরম প্রিয়তমের সান্নিধ্যে ঊর্ধ্বলোকে পাড়ি জমান।নবীজির ইন্তিকালের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) খলিফা নির্বাচিত হলেন। দেখা গেল চারিদিকে বিদ্রোহের আগুন। কেন্দ্রীয় সরকারকে জাকাত দিতে অস্বীকারকারী, মিথ্যা নবুয়াতের দাবিদার ভ-নবীরা, বিদ্রোহী ধর্মত্যাগীরা মিলে মদীনা আক্রমণের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। শীর্ষ পর্যায়ের সাহাবীরাও পরামর্শ দিলেন, মদীনার চারপশের বিদ্রোহ দমন করা পর্যন্ত উসামার অভিযান বিলম্বিত করা হোক। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) অবিচল দৃঢ়তায় জবাব দিলেন, যদি মদীনায় হিং¯্র জন্তুরা আমার লাশও নিয়ে যায়, তবু যে ঝা-া নবীজি উসামার হাতে তুলে দিয়েছেন তা আমি নামাতে পারব না। তিনি উসামার কাছে অনুমতি চাইলেন, রাষ্ট্রীয় কাজের প্রয়োজনে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)কে মদীনায় রেখে যাওয়া হোক। উসামা অনুমতি দিলেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সেনাদলকে পায়ে হেঁটে অনেকদূর এগিয়ে বিদায় জানালেন। উসামা সিরিয়ায় কয়েকটি অভিযানে আশাতীত সাফল্য নিয়ে মদীনায় ফিরলে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানানো হয়।বহু দক্ষ, অভিজ্ঞ, যোগ্য ও সিনিয়ররা থাকতে নবীজি যুবক উসামাকে কেন দূর সিরিয়ায় রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানে অধিনায়ক নিযুক্ত করলেন তা নিয়ে ইতিহাসবেত্তাদের বিশ্লেষণের অন্ত নেই। কিন্তু যে বিশ্লেষণটি ইতিহাসের পাতা থেকে সংগ্রহ করতে পারিনি তাহল, মূলত নবীজি অন্তিম শয়ানে উসামার হাতে সিরিয়া অভিযানের ঝা-া তুলে দিয়ে যুবকদের হাতেই ইসলামের ঝা-া তুলে দিয়েছেন। এখন ইসলামের যুবক-তরুণ সন্তানদের কর্তব্য, সেই ঝা-া দুই হাত ও বুকের সকল শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরা আর ভবিষ্যৎকে জয় করার সংকল্পে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়া।