ইসলাম আত্মপ্রকাশের প্রথম দিন থেকেই অর্থনীতির মূলনীতি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে, যা নবী (সা.)-এর জীবনদর্শন ও সুন্নাহতে প্রতিফলিত হয়েছে। নবীযুগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব জীবনের সঙ্গে আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনার সমন্বয়ও ছিল। বাণিজ্য, কৃষি, শ্রম, জাকাত ও ওয়াক্ফসহ বিভিন্ন উপাদান সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল, যা সামাজিক ন্যায়বিচার, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উন্নয়ন নিশ্চিত করেছিল। এই ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোই ইসলামী সভ্যতার উত্থানের শক্তিশালী ভিত্তি ছিল।
মক্কায় নবী (সা.) জন্মগ্রহণ ও শৈশব অতিবাহিত করেন, যেখানে তিনি ছোটবেলা থেকে পশুচারণ ও ব্যবসায় যুক্ত হন এবং সততা ও দক্ষতার কারণে ‘আল-সাদিক, আল-আমিন’ খ্যাতি অর্জন করেন। খদিজা (রা.)-এর পণ্যে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে তিনি অনন্য সফলতা ও আস্থা অর্জন করেন, যা পরবর্তী সময়ে খদিজা (রা.)-এর বিয়ে ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে প্রতিফলিত হয়। নবী (সা.) শৈশব থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শ্রম ও কর্ম প্রচেষ্টায় নিবিষ্ট ছিলেন। তার পরও মক্কিযুগে মুসলমানরা কুরাইশদের নিপীড়নের কারণে স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, তবে কুরাইশদের অর্থনৈতিক অবরোধ ও সম্পদ হরণ সত্ত্বেও পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
নানা পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার মক্কার অভিজ্ঞতা মদিনায় নবী (সা.)-এর রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠনে কাজে আসে। তিনি মদিনায় একটি স্বতন্ত্র সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন। নববী দূরদর্শিতার প্রতিফলন দেখা যায় আনসার, মুহাজির ও ইহুদিদের অধিকার সংরক্ষণ, পারস্পরিক সম্পর্ক, দেনাপ্রাপ্তি, যুদ্ধ ও শান্তির সময় আচরণবিধি ইত্যাদি নির্ধারণকারী দলিলে। (আল-ইকতিসাদ ফি হায়াতি মুহাম্মদ (সা.), ড. আবদুল হালিম আওয়িস)
মদিনার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
১. স্বতন্ত্র ইসলামী অর্থনৈতিক ধারণা : সব সম্পদ আল্লাহর, মানুষের মালিকানা শুধু শ্রম ও প্রচেষ্টার ভিত্তিতে।
মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে গরিব ও অভাবীদের দেখাশোনা করতে বাধ্য।২. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পারস্পরিক সহযোগিতা : মুহাজির ও আনসারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, আয়ের সুষম বণ্টন ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে ন্যায্যতা নিশ্চিত। ইয়াতিম ও দরিদ্রদের যত্ন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
৩. ব্যক্তিগত উদাহরণ ও নৈতিক শিক্ষা : এ ক্ষেত্রে আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.) ও সাদ ইবনু রাবিয়া (রা.)-এর ঘটনা দেখায় যে সততা, আত্মত্যাগ ও ব্যাবসায়িক দক্ষতা কিভাবে অর্থনৈতিক সফলতা ও সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে।
মোটকথা সততা, ন্যায্যতা, সামাজিক সহযোগিতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের আদর্শে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল মদিনাযুগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামে অর্থের বৈধতা ও পবিত্রতা
নবী (সা.) অর্থ ও ব্যবসায় সততা, স্বচ্ছতা ও হালাল প্রক্রিয়ার গুরুত্ব প্রদর্শন করেছেন। হারাম সম্পদ, প্রতারণা, মনোপলি বা অসৎ ব্যবসা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থের উৎস হালাল এবং ব্যয় ন্যায়সংগত হওয়া আবশ্যক। নবী (সা.) বাজারে সরাসরি অসততা রুখতেন এবং সঠিক পরিমাপ ও ন্যায্য লেনদেন নিশ্চিত করতেন।
মহানবী (সা.) অর্থনৈতিক নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে ইসলামী সমাজের ভিত্তি গঠন করেছিলেন।