সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কৃষিঋণ কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পদক্ষেপ নিন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার পড়া হয়েছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রার ঘোষণাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত ১২ আগস্ট বলেছেন, ‘কৃষিঋণের সবটাই কৃষকের কাছে পৌঁছায় কি না, বাংলাদেশ ব্যাংক তা পর্যালোচনা করছে। আমরা চাই, শতভাগ কৃষিঋণ কৃষকের কাছে যাক। দালালের কাছে যেন না যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এটি তদারকি করবে।

কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে বলি, যে দেশের কৃষকদের একটি বড় অংশ এখনো নিরক্ষর, ঋণলাভের আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালন বিষয়ে যাদের ধারণা একেবারেই অপ্রতুল, নানা কাগজপত্র ও দলিলের চাহিদা মিটিয়ে ঋণ গ্রহণের বিষয়ে যারা একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, ঋণলাভের ক্ষেত্রে পদে পদে যেখানে দালাল ও নানা অবাঞ্ছিত শ্রেণির দৌরাত্ম্য এবং বহুক্ষেত্রে ব্যাংক ও ব্যাংকের বাইরের নানা হয়রানি ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে, তখন কৃষকের প্রতি ওই মমতাপূর্ণ আচরণের কোনো বিকল্প আছে কি?আর তাই কৃষিঋণের শতভাগ প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধান ও পরিধারণ ব্যবস্থাকে জোরদার করার পাশাপাশি ব্যাংককর্মীদের মধ্যে কৃষকের প্রতি মমতা সৃষ্টির লক্ষ্যেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি প্রস্তাব করি। ব্যাংকগুলোর প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (বিআইবিএম) ও অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাংককর্মীরা প্রশিক্ষণ নেন, সেসব কোর্সের প্রশিক্ষণসূচিতে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র ক্লাস অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা প্রেরণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচি যাতে অভিন্ন হয়, তজ্জন্য উল্লিখিত নির্দেশনার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি রূপরেখাও তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে, যেখানে কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা কেন ও কিভাবে কৃষকের প্রতি মমতাপূর্ণ সহায়ক আচরণ করবেন, সে বিষয়ের বর্ণনা থাকবে।তদুপরি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বর্তমানে কৃষি ও পল্লী ঋণের অধীন যেসব অঙ্গ (component) নিয়মিত ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ ও পরিধারণ করা হয়, এখন থেকে সে তালিকায় কৃষকের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এবার আসা যাক কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হওয়া একটি নতুন অনুষঙ্গের প্রতি। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক। কৃষকরা যাতে সহজে কৃষিঋণ ও কৃষি উপকরণ পেতে পারেন, সে জন্য মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ও পেট্রোকেম (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মধ্যে গত ৭ আগস্ট একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় পেট্রোকেম কৃষকদের মধ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার, কীটনাশক, আগাছানাশক, ছত্রাকনাশক, উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক, বীজ ইত্যাদি কৃষি উপকরণ সরবরাহ করবে এবং পেট্রোকেমের কাছ থেকে এসব উপকরণ ক্রয়ের জন্য ঋণ দেবে এমটিবি।অভাবে পড়ে দরিদ্র কৃষক যেমন দাদনদারের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পরে নিম্নমূল্যে তাঁর কাছে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন, এটি অনেকটা সেই দাদনদারি ব্যবস্থার মতোই হয়ে গেল না? ঋণ পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু সে ঋণ কেবল তখনই মিলবে, যখন কৃষক তাঁর কৃষি উপকরণ পেট্রোকেমের কাছ থেকে তাদেরই (পেট্রোকেমের) নির্ধারিত মূল্যে কিনবেন। এ ক্ষেত্রে কৃষকের হাতে উপকরণ বাছাই বা মূল্য নিয়ে দরদাম করার কোনো বিকল্প সুযোগই থাকছে না।বিষয়টির সঙ্গে ব্যাপক মিল রয়েছে বিদেশি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সাপ্লাইয়ারস ক্রেডিট বা সরবরাহকারী ঋণের। পার্থক্য শুধু এটুকু যে উল্লিখিত সাপ্লাইয়ারস ক্রেডিটের দাতারা বিদেশি, আর এ ক্ষেত্রে এর সরবরাহকারী হচ্ছে বাংলাদেশভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেট্রোকেম।

কৃষিঋণের শতভাগ প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগে বেশ কিছু বড় মাত্রার সমস্যা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আগেকার সামাজিক টাউটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক টাউটের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়া, ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসার, কৃষিঋণ বিতরণে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নির্লিপ্ততা ইত্যাদি অন্যতম। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা আসলে কৃষক ও ব্যাংকের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে না ওঠা, যেটি ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে বহুলাংশে গড়ে উঠেছে।

মোট অভ্যন্তরীণ উপাদানের (জিডিপি) ক্ষেত্রে কৃষি খাতের দৃশ্যমান যে অবদান, এ খাতের ওপর সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির প্রকৃত নির্ভরতা তারচেয়ে অনেক বেশি। এখনো এ খাতই দেশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। জাতীয় অর্থনীতি যখন বড় ধরনের বিপদে পড়ে, তখন এই কৃষিই দেশকে রক্ষা করে, যেমনটি করেছিল ২০০৭-০৮-এর বিশ্বমন্দার সময়। অতএব সার্বিক বিবেচনায় কৃষিঋণের শতভাগ প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোটা শুধু জরুরিই নয়, একটি জাতীয় অগ্রাধিকারও বটে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের অগ্রাধিকারে কৃষিঋণ কখনোই প্রথম সারিতে ছিল না, এখনো নেই এবং তা শিগগিরই হবে, তেমন লক্ষণও চোখে পড়ছে না।

এই সূত্রে পরিশেষে আরেকটি প্রস্তাব যোগ করি। কৃষি খাতে বিনিয়োগকে এখনো আমরা নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে আগ্রহোদ্দীপক ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। স্টার্টআপ কার্যক্রমকে উৎসাহদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৯০০ কোটি টাকার নয়া তহবিল ঘোষণা করেছে, সেখানে তরুণদের কৃষি খাতে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে না কেন? কেন মনে করা হচ্ছে, উদ্ভাবনাধর্মী সম্ভাবনাময় প্রকল্প কেবল শহরেই পাওয়া যায়? কৃষিঋণের শতভাগ প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হলে এ ধরনের শহরমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, তার পুরোটা না হোক, অন্তত ৯০ শতাংশও যদি প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তাহলে সেটাই হবে অনেক বড় অগ্রগতি।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com