মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৯ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা তারেক রহমান আপিলে খালাস

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে গতকাল বৃহস্পতিবার এই রায় দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ। হাইকোর্টের রায়ের কিছু অংশ সংশোধন ও বাদ দিয়ে পর্যবেক্ষণসহ এই রায় দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।

রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ‘একটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ছাড়া হাইকোর্টের রায়ে কোনো ত্রুটি বা অবৈধ কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি।ফলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে হাইকোর্টের ওই পর্যবেক্ষণ বাতিল এবং রায়ের কার্যকরী অংশে সংশোধন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করা হলো। একই সঙ্গে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখা হলো।’

বিচারিক আদালতের রায় অবৈধ ঘোষণার পাশাপাশি তা বাতিল করে গত ১ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। এই রায়ের ফলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ বিচারিক আদালত যাঁদের সাজা দিয়েছিলেন, তাঁদের সবাই খালাস পান।পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। সেই আপিল খারিজ করে রায় দিলেন সর্বোচ্চ আদালত।আদালতের আপিলের ওপর শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাহমুদ (মাসুদ)। আসামিপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ শিশির মনির।রায়ের পর সর্বোচ্চ আদালতের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আইনজীবী এস এম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত আপিলসহ সব আবেদন খারিজ করেছেন। অর্থাৎ হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল আছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ ন্যায়ের মানদণ্ড আবার উঁচু করে ধরলেন। এই রায়ের মাধ্যমে আবার প্রমাণিত হলো, আইনের শাসন আছে। বিনা বিচারে অন্যায়ভাবে কাউকে ফাঁসি বা সাজা দেওয়া যাবে না।আপিল শুনানির সময় তারেক রহমানের পক্ষে আদালতে ছিলেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মামলাটি ছিল একটি জঘন্য অপরাধের মামলা। কিন্তু শেখ হাসিনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ব্যক্তিগত জিঘাংসা থেকে তারেক রহমানকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আজ সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, তারেক রহমান নির্দোষ। তিনি খালাস পেয়েছেন। পাশাপাশি এটাও প্রমাণিত হয়েছে, এই ঘটনায় আইভি রহমানসহ যাঁদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়েছে, শেখ হাসিনা সেইসব মৃত্যুর বিচার চাননি। যদি শেখ হাসিনা প্রকৃত অপরাধীদের বিচার চাইতেন, তাহলে হয়তো রাজনৈতিক জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে তারেক রহমানকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতেন না।’ এই রায়ের জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কায়সার কামাল।

স্বীকারোক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন : এই মামলায় মুফতি হান্নানসহ ১২ জন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, যে পরিস্থিতিতে আসামিদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে, সেসব জবানবন্দি কতটুকু স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ আছে। যেমন—কথিত মূল পরিকল্পনাকারী মুফতি আব্দুল হান্নান প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার চার বছর পর দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দ্বিতীয় জবানবন্দির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার আগে তিনি দীর্ঘ সময় কনডেমড সেলে বন্দি ছিলেন। অন্য আসামিরাও দীর্ঘ সময় পুলিশি হেফাজতে থাকার পর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দি দেন। এ ছাড়া তিনজন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি একজন ম্যাজিস্ট্রেট এক দিনে অস্বাভাবিক গতিতে রেকর্ড করেন, যা এসংক্রান্ত নিয়ম-নীতির গুরুতর লঙ্ঘন। বেশির ভাগ আসামি তাঁদের স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, স্বীকারোক্তি নেওয়ার আগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাঁদের অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন করে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া অবৈধভাবে হেফাজতে রেখেছিল। ফলে স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

সর্বোচ্চ আদালত বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, কথিত অভিযুক্ত মুফতি আব্দুল হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুসারে তাঁকে স্বীকারোক্তির বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা মামলাটিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছে। ফলে এসব স্বীকারোক্তি হয় চাপ প্রয়োগ করে, নয় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আদায় করা হয়েছে, যা আইনের চোখে বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে বিবেচিত হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত বলেন, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এই স্বীকারোক্তিগুলো নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ বিষয়টি হাইকোর্টের রায়ে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা পর্যালোচনা করা উচিত ছিল।

মামলার তদন্ত নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ বাদ : মামলাটি নতুন করে তদন্ত করা প্রয়োজন উল্লেখ করে হাইকোর্ট রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, তা সঠিক নয় উল্লেখ করে বাতিল করেছেন সর্বোচ্চ আদালত। এ নিয়ে আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, মামলার নথিভুক্ত তথ্য এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে এই পর্যবেক্ষণ সংগতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া কোনো নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রভাব তৈরি করে এমন কোনো পর্যবেক্ষণ আদালত দিতে পারেন না। ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতির ভিত্তিতে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণটি বাতিল করা প্রয়োজন। কারণ এই পর্যবেক্ষণ নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বিচারিক হস্তক্ষেপের শামিল।

এই পর্যবেক্ষণ ছাড়া হাইকোর্টের রায়ে কোনো ত্রুটি বা অবৈধ কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে সর্বোচ্চ আদালত রায়ে বলেন, ‘ফলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ বাতিল এবং রায়ের কার্যকরী অংশে সংশোধন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করা হলো। একই সঙ্গে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখা হলো। সাজাপ্রাপ্ত (বিচারিক আদালতের রায়ে) যেসব আসামি আপিল করেননি, খালাসের এই রায় তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এই মামলায় কারো বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকলে তা প্রত্যাহার করা হলো। আর আপিলের অনুমতির জন্য সংযুক্ত সব ফৌজদারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হলো।

মামলার বৃত্তান্ত : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের দাবি, ওই হামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হামলার পরদিন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। থানা পুলিশ, ডিবির হাত ঘুরে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার পায়। ঘটনার চার বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যার অভিযোগ এবং বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। জঙ্গি দল হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে সেখানে আসামি করা হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করে তাঁদের বিচারও শুরু হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। সিআইডির বিশেষ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই আসামির তালিকায় আরো ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন। সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ চারদলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নাম আসে। দুই মামলায় মোট ৫২ আসামির বিচার শুরু হলেও অন্য মামলায় তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় মোট ৪৯ আসামির বিচার করেন বিচারিক আদালত। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই মামলার রায় হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় রায়ে।

আর তারেক রহমান এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব প্রয়াত হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। সেই সঙ্গে ১১ জন পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। রায়ের পর ওই বছরের ২৭ নভেম্বর বিচারিক আদালতের রায় প্রয়োজনীয় নথিসহ হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় এসে পৌঁছে। দণ্ডিতরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।

ডেথ রেফারেন্স-আপিলের পেপারবুক প্রস্তুত হলে ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর শুরু হয় শুনানি। বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শেষ পর্যায়ে ছিল। তখন ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর বিচার বিভাগেও পরিবর্তন আসে। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ওবায়দুল হাসানের পদত্যাগের পর আপিল বিভাগের আরো পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগ করেন। নতুন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ গত বছরের ১১, ১২ ও ১৫ আগস্ট এখতিয়ার পরিবর্তন করে হাইকোর্টের ৫৪টি হাইকোর্ট বেঞ্চ পুনর্গঠন করেন। বেঞ্চ পুনর্গঠনের পর মামলাটি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চে আসে। গত বছরের ৩১ অক্টোবর এই বেঞ্চে নতুন করে শুনানি শুরু হয়। ২৮ নভেম্বর চূড়ান্ত শুনানির পর ১ ডিসেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। খালাসের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি (লিভ টু আপিল) চেয়ে কয়েকটি আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ১ জুন সেই আবেদন মঞ্জুর করে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। গত ১ জুলাইয়ের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ (কনসাইজ স্টেটমেন্ট) জমা দিলে ১৭ জুলাই শুনানি শুরু হয়ে শেষ হয় গত ২১ আগস্ট। সেই ধারাবাহিকতায় গতাকাল বৃহস্পতিবার রায় দেওয়া হলো।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com