সম্প্রতি বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে এক আলোচনাসভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বাঘ শুধু প্রাণী নয়, আমাদের অহংকার। বাঘ সংরক্ষণের সুফল জনগণের সামনে দৃশ্যমান করতে হবে। কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কারণে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। মানুষ-বাঘ দ্বন্দ্বও বেড়েছে। এ জন্য সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। বাঘ রক্ষায় সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পও রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ ও শিকারি প্রাণী জরিপ, উঁচু টিলা ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালের বাঘ জরিপ মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ১২৫। সুন্দরবনে এক হাজার ২১০টি ক্যামেরা ৩১৮ দিন রেখে এই জরিপ করা হয়। ১০ লাখেরও বেশি ছবি ও ভিডিও পাওয়া যায়। পরে ভারত, নিউজিল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করলে শিকার একেবারেই কমে যাবে। এ ছাড়া পাচার ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। ফাঁদ পেতে, বিষটোপ দিয়ে বাঘ শিকার করা হয়। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের সমন্বয়ে দক্ষ টিম থাকতে পারে। আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।
সম্প্রতি চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে একটি আচরণবিধি প্রকাশ করেছে। চীনের উত্তর-পূর্বে থাকা মানুষের কথা মাথায় রেখে এই আচরণবিধি করা হয়। এর মাধ্যমে সেখানে মানব-বাঘ দ্বন্দ্ব কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব এড়াতে এমন আচরণবিধি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাঘ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে থাকে। প্রথমত, সেই এলাকাকে সংরক্ষিত রাখা দরকার। এরা সাধারণত রাতে শিকার করে। হরিণ বা বন্য শূকর এদের প্রিয় খাবার। এ ক্ষেত্রে এসব খাবার যেন থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এসব বিষয় সামনে রেখে আমাদের সুন্দরবন এলাকার বাঘ ও বসবাসরত মানুষের দিকে নজর রেখে একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যাতে বাঘ দেখলেই মানুষ যেন ভীত না হয় আর তাকে মেরে না ফেলে।
ইদানীং অনেকেই প্রশ্ন করেন, এত টাকা খরচ করে বাঘ জরিপ করার প্রয়োজনীয়তা কী? অনেকেই এর বিরোধিতাও করেন। এ জন্য কিছু কারণ এখানে তুলে ধরা হলো। প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, বাঘ সংরক্ষণের জন্য যে নীতিমালা নেওয়া হয়েছে, সেই নীতিমালা প্রয়োগে বাঘের সংখ্যা আদৌ বাড়ছে না কমছে, তা বোঝা যায়। বাঘের মোট সংখ্যা কত, কোথায় কতটা বিস্তৃত, এর সংখ্যা বাড়ছে না কমছে, তা নির্ণয় করা যায়। বেঁচে থাকার জন্য যে বাস্তুতন্ত্র থাকা দরকার, তেমন বাস্তুতন্ত্র আছে কি না, যা বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। হরিণ বা বন্য শূকরের মতো প্রাণীগুলো, যা বাঘ শিকার করে তাদের স্বাস্থ্য এবং তারা যথাযথ পরিমাণে বাস্তুতন্ত্রে বসবাস করছে কি না, তা-ও এসব জরিপের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব। বাঘ-মানব দ্বন্দ্ব কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, এই জরিপের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্তও নেওয়া যাবে। এর মাধ্যমে একটি বনকে সুরক্ষিত রাখার সব কলাকৌশল ঠিক করা যায়। তাই বাঘ জরিপের গুরুত্ব এককথায় অপরিসীম।