মানুষের জীবন গঠনে তাঁর বাল্যকালের ভূমিকা ব্যাপক। নজরুল জীবনীকার আজহারউদ্দীন খান তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ (১৯৫৪) জানাচ্ছেন যে পশ্চিমদেশীয় কয়েকজন মৌলবি দশ বছর বয়সী বালক নজরুলের মুখে ‘এমন নির্ভুল ও দ্রুত কোরান পাঠ শুনে তাঁরা অবাক হয়ে যান।’ (পৃ. ৪)হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কিত নজরুলের আটটি কবিতা আছে ‘বনগীতি’ দ্বিতীয় খণ্ডে। মোট ২১টি কবিতার মধ্যে মুহাম্মদ (সা.)-কে সরাসরি নিবেদিত আটটি কবিতার ক্রমিক সংখ্যা ১ থেকে ৮। পরের চারটি কবিতা হলো খোদা-বন্দেগি এবং বাকিগুলো অন্যান্য বিষয় নিয়ে ভক্তিমূলক১ নং ও ২ নং কবিতার শিরোনাম যথাক্রমে ‘আবির্ভাব’ ও ‘তিরোভাব’। অর্থাৎ রসুলে আকরামের জন্ম ও মৃত্যুক্ষণ। বাকি ছয়টি কবিতা শিরোনামবিহীন। ‘আবির্ভাব’-এর প্রথম স্তবকটি হলো এ রকম : ‘নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া/কে এলো মক্কায় আমিনার কোলে।/ফাগুন-পূর্ণিমা-নিশীথে যেমন/আসমানের কোলে রাঙা-চাঁদ দোলে।’বনগীতি’ গ্রন্থে অবশ্য নজরুলের বিখ্যাত গানটি নেই, যেটিতে মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে নজরুলের কাতরতা অসীম কাব্যবেদনায় স্ফূরিত : ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে/যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।’ এটির সূত্রের সন্ধানও এক অর্থে ইউসুফ আলীর ধারাবিবরণীতে পাওয়া যায় : ‘দেখ! মর্ত্যে এক নিরক্ষর প্রেরিত পুরুষ জন্ম নিলো সুন্দর এক শিশু হিসেবে, অভিজাত তাঁর জন্ম, তার চেয়েও অভিজাত তাঁর জ্ঞান আর মানবপ্রীতি, তাঁর বুঝদার মন, যাঁকে সৃষ্টিকর্তা সেই চাবিটি দিয়ে পাঠিয়েছেন, যার ফলে বিস্ময়জাগানো প্রকৃতি তাঁর চোখের সামনে খুলে যায়। তিনিই প্রজ্জ্বলন্ত উচ্চারণে মহান সৃষ্টিকর্তার আধ্যাত্মিক সত্যকে দিকে দিকে প্রচার করবেন।’নজরুল প্রায় সমার্থক উচ্চারণে লিখছেন, ‘মানুষে মানুষে অধিকার দিল যে জন/এক আল্লাহ ছাড়া প্রভু নাই কহিল যে জন/মানুষের লাগি চির দীনহীন বেশ ধরিল যে জন/বাদশা ফকিরে এক শামিল করিল যে জন।’ ৩ নং গানে রসুলে করিমকে সম্বোধন করছেন, ‘হে মদিনার বুলবুলি গো’; ৪ নং গানে বলছেন, ‘দীন দরিদ্র কাঙালের তরে এই দুনিয়ায় আসি/হে হজরত, বাদশা হয়ে ছিলে তুমি উপবাসী।’ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নজরুল সাম্যবাদী দৃষ্টিতে অবলোকন করে একই গানে বলছেন, ‘আজ মানুষের ব্যথা অভাবের কথা ভাবিবার কেহ নাই/ধনী মুসলিম ভোগ ও বিলাসে ডুবিয়া আছে সদাই,/তাই তোমারেই ডাকে যত মুসলিম গরিব শ্রমিক চাষি।’ পরের গান ৫ নং-এ বলছেন, ‘পাঠাও বেহেশত হতে, হজরত পুনঃ সাম্যের বাণী,/আর দেখিতে পারি না মানুষে মানুষে এই হীন হানাহানি।’নজরুল ১৯৩৩ সালে কোরআন থেকে ৩৮টি সুরা অনুবাদ করে ‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সেখানে ঋণ হিসেবে মাওলানা মোহাম্মদ আলী, তসফির আল হোসাইনী, তসফির আল বাজাবি, তসফির-ই-কবিরসহ প্রমুখের নাম উল্লেখ করলেও আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর নাম নেই। আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর ‘দ্য হোলি কোরান : টেক্সট, ট্রান্সলেশন এ্যান্ড কমেন্ট্রি’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে, নজরুলের ‘কাব্য আমপারা’র এক বছর পরে। তাই ধরে নেওয়া যায় নজরুল ইউসুফ আলীর অনুবাদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না।তবে নজরুল যে বাল্যকাল থেকেই কোরআন-শিক্ষিত ছিলেন সে জন্য তাঁর রসুলে করিম বন্দনার বহু উৎস স্বয়ং পবিত্র কোরআন শরিফ। আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর পরিশিষ্ট অংশে কোরআন শরিফের যেসব সুরা ও আয়াতে রসুলে করিমের উল্লেখ আছে, সেগুলো গুনে দেখলাম মোট ছিয়াশিবার। কবি নজরুলের কোরআন-প্রশিক্ষিত মনে নিশ্চয় এই ব্যাপারটি উপেক্ষিত হয়নি।এই ছিয়াশিবার থেকে আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর ইংরেজি তর্জমা থেকে মাত্র দু-একটি সুরা এবং আয়াতের বাংলা তর্জমা করলে বোঝা যাবে কবি নজরুলের মানসিক ভুবন প্রকৃত অর্থে রসুলে আকরামের প্রতি ভক্তি নিয়ে সর্বব্যাপী আচ্ছন্ন ছিল।২ নং সুরা আল বাকারার ১০৪ নং আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা নবীকে দ্ব্যর্থবোধক কথা বলিও না, বরঞ্চ তাঁকে সম্মান করো ও তাঁর কথা শোনো, আর যারা বিপথগামী তাদের জন্য থাকবে কঠিন শাস্তি।’ ৭ নং সুরা আরাফের ১৫৮ নং আয়াতে মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষেরা, তোমরা বলো, আমি আল্লাহর প্রেরিত নবী এবং আল্লাহর অধীনে সমস্ত বেহেশত ও ধরণি।’ ৪৮ নং সুরা ফাৎ বা বিজয়ের ৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘আমরা তোমাদের কাছে সুখবর দেওয়ার জন্য একজন সাক্ষী পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদেরকে সাথে সাথে সতর্কও করে দেবেন।’এ রকম আরো বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে। তবে আমাদের আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক হলো নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যে যে একটি বীরত্বব্যঞ্জক হিরোয়িক কোড তৈরি হয়েছিল, সেটি তাঁর প্রারম্ভিক জীবনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্ট, কিন্তু ক্রমে ক্রমে নজরুল তাঁর প্রথম সন্তান ও দ্বিতীয় সন্তানের অকালমৃত্যুতে গভীর শোকে নিমজ্জিত হন, তখন তাঁর মন যায় আধ্যাত্মিকতার দিকে। নিজের ধর্মজ্ঞান যেহেতু শৈশব থেকেই সুদৃঢ় ছিল, তখন তিনি আধ্যাত্মিক জগতে বিচরণ করতে গিয়ে নবীজির মধ্যে নিজের মুশকিল আসান দেখেন। যে হিরোয়িক কোড তিনি কিছুটা সেক্যুলার অর্থে ১৯২২ সালে তৈরি করেছিলেন, সেটি ১৯৩০-এর প্রথম থেকেই নবীজির মধ্যে সংস্থাপিত হয়। নবীজিই হয়ে পড়েন তাঁর নতুন বীর। ‘বনগীতি’র ৬ নং গানে লিখছেন, ‘মোহাম্মদ নাম যতই জপি, ততই মধুর লাগে/নামে এত মধু থাকে, কে জানিত আগে\’ ঠিক পরের ৭ নং গান শুরু করছেন এই নিবেদন দিয়ে : ‘মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি/মোহাম্মদ নাম জপ-মালা।/ওই নামে মিটাই পিপাসা/ঐ নাম কওসরের পিয়ালা।’ এমনকি কবি কল্পনা করছেন যে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রেরণা পশুপাখি জীবজগতেও বিচরণমান : ‘মোহাম্মদ নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে/তাই কি ও তোর কণ্ঠের গান এমন মধুর লাগে।’নজরুলের ৪৯তম প্রয়াণ দিবসে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।