জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্ব^াভাবিক করতে কঠোর হচ্ছে পুলিশ। এরই মধ্যে অবৈধ অস্ত্র, মাদক এবং চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশ সদর দফতর থেকে মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে বিশেষ বার্তা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার কথাও ভাবছে সরকারের শীর্ষ মহল।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে যেভাবে রয়েছে, আমার মনে হয় নির্বাচন করতে তেমন অসুবিধা হবে না। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আমরা পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছি। আমরা অনেক আগে থেকেই মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছি। আমার দায়িত্ব ভোট কেন্দ্র দেখা না, ভোটের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বাইরে থেকে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া।গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ সদর দফতরে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন খোদ কমিশনার সাজ্জাত আলী। ছিনতাই, চাঁদাবাজি রোধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আগাম প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে ফুট পেট্রোলিং এবং মোটরসাইকেল পেট্র্রোলিং বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরা সচল আছে কিনা তা দেখে ব্যবস্থা নেওয়াসহ টানা পার্টি দমনে বিশেষ নির্দেশ দেন কমিশনার।সূত্র বলছে, রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব এলাকাতেই ঘটছে খুনাখুনি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক হানাহানি এবং সামাজিক বিরোধের মতো ঘটনা। সীমান্ত দিয়ে এখনো আগের মতোই ঢুকছে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র-মাদক। পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে (জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫) হত্যা মামলা হয়েছে তিন হাজার ৮৫৭ টি। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারি-জুনে গড় ছিল মামলা ছিলো ২৫৬ টি। বাড়ছে খুন। রাজধানীতেই ছয় মাসে ২১৭ খুন হয়েছে, যার বেশির ভাগ রাজনৈতিক কারণে। এক বছরে ডাকাতি-দস্যুতা মামলা হয়েছে তিন হাজার ৪৫৭ টি। যা আগের বছরের চেয়ে ৮৩৮ টি বেশি। গড়ে প্রতি মাসে মামলা হয়েছে ২০৫ টি। সর্বাধিক মামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে ৫৮০ টি ও মহানগরে ৪৫২ টি। মহাসড়কে রাতের পর রাত হচ্ছে গণডাকাতি। এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৮৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাঝে অনেক ফারাক। যত দিন যাবে, নির্বাচনের আগে অপরাধ আরো বাড়বে। অতীত অভিজ্ঞতাও তাই বলে। নির্বাচন ঘিরে অশনি সংকেত স্পষ্ট। সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অপরাধ দমন, আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ। অপরাধীকে অন্য কোনো পরিচয়ে বিবেচনা করা হলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে সরকারকে। জুলাই বিপ্লবের পর ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। এখনো অভিযানে আতঙ্কে ভুগছে পুলিশ সদস্যরা। মাঝেমাঝেই ঘটছে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা। অপরাধীদের ধরতে গেলেই চলছে তদবির-রাজনৈতিক চাপ। বিপরীতে বেপরোয়া হচ্ছে অপরাধীরা। চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ময়মনসিংহে হাসপাতাল মালিকরা ও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, মাঝেমাঝেই তারা আইন প্রয়োগে বাধার মুখে পড়ছেন। বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের ভূমিকা অনেকটা গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার মতোই। জানা গেছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ধানমন্ডির ২৫ স্পট ছিনতাইকারীদের দখলে। রাজধানীতে সক্রিয় ছিনতাইকারী অন্তত নয় শতাধিক। ৫ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছে সাতজন। সর্বশেষ কারওয়ান বাজারে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হন বঙ্গভবনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সুমন রেজা। এর আগেও শাহবাগ, ধানমন্ডি, পুরান ঢাকায় একের পর এক রক্তাক্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতি-ছিনতাইও থামছে না। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডাকাতি মামলা হয়েছে এক হাজার ৩৬৩ টি। এর মধ্যে মে মাসেই হয়েছে ২৪৪টি মামলা। মহাসড়কে কুমিল্লা, পাবনা, পঞ্চগড়ে গণডাকাতি বেড়েছে। ঘরে ঢুকে খুন, রাস্তায় অস্ত্র ঠেকিয়ে লুটের ঘটনা ঘটছে। এর বাইরে গত ৯ জুলাই মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে খুনের বীভৎস দৃশ্য এখনো ভুলতে পারছেন না অনেকেই। ৮ মে বাড্ডায় ঠিকাদার আনোয়ার হোসেন, পুলিশ প্লাজার সামনে টেলি সুমন হত্যাকা- এবং ১৫ মে একই এলাকায় বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যার ঘটনাও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর বরখাস্তকৃত মেজর সাদিক দম্পতির ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সরকারের শীর্ষ মহলকে। যদিও পুলিশ পরিদর্শক বাহারুল আলম দাবি করেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস্) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাবের প্রতিটি সদস্য তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করছে।