এ ছাড়া সার্ককে কিভাবে আরো কার্যকর ও শক্তিশালী করা যায় তা নিয়েও আলাপ হয়েছে।’তিনি আরো বলেন, ‘গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা একপেশে হয়ে পড়েছিল। আমরা মনে করি, এই অঞ্চলের সব দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা দরকার। পাকিস্তান সরকারও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে, আমরাও একইভাবে গুরুত্বারোপ করেছি।’
ডা. তাহের জানান, আঞ্চলিক অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা ফিলিস্তিন ইস্যুতে সব মুসলিম রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে। এ বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বৈরী সম্পর্ক কাটিয়ে সুসম্পর্কে জোর এনসিপির : এনসিপি নেতারা গতকালের বৈঠকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অতীতের বৈরী সম্পর্ক থেকে বের হয়ে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একাত্তরের ইস্যু পাকিস্তানের ‘ডিল’ করা উচিত বলে বলেছে দলটি। গতকাল বিকেলে পাকিস্তান হাইকমিশনে ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করে এনসিপির সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানেই এসব কথা বলা হয় বলে পরে সাংবাদিকদের জানান এনসিপি সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
আখতার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “পাকিস্তান নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের যে ধারণা, সেটা তাদের কাছে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। এনসিপি মনে করে, বিগত সময়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক ছিল, সেখান থেকে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জনগণের যে পারসেপশন, সেটাকে আমাদের সবচেয়ে সেনসিটিভ আকারে বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, যেকোনো ধরনের সম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একাত্তর ইস্যুকে অবশ্যই ‘ডিল’ করা উচিত। আমরা সে প্রসঙ্গ তাদের কাছে উত্থাপন করেছি।”
১৯৭১ সাল সম্পর্কিত অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে আখতার হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি পাকিস্তান জানাবে।’ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি, একাত্তর বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা উচিত। তারা বলেছে, তারা এটাতে প্রস্তুত।’
ইসহাক দারের সঙ্গে এনসিপির আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের শিক্ষায়, অর্থনীতিতে এবং সংস্কৃতিতে সম্পর্ক উন্নয়নের যে সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশসহ যেসব প্রতিবেশী দেশ রয়েছে, তাদের মধ্যকার সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বের। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বড় ভাইসুলভ, কোনো ধরনের আগ্রাসন, কোনো ধরনের আধিপত্যবাদ, আধিপত্যবাদী মানসিকতা থাকবে না, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘এখানে তাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামগুলো, সেগুলো কিভাবে উন্নয়ন করা যায়, প্রতিরক্ষা খাতে কিভাবে উন্নয়ন করা যায়, সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলেছি।’ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান মুখ্য সমন্বয়ক। পাশাপাশি নদী ও ওষুধশিল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
সার্ক নিয়ে বৈঠকের বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ভারতের কারণে সার্ক নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ককে কিভাবে আরো সক্রিয় করা যায়, এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাকিস্তানও পরমাণু অস্ত্রের দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানেরও অনেক প্রভাব রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আজ : আজ রবিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
সম্ভাব্য চুক্তিটি হলো দুই দেশের সরকারি ও কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের ভিসা বিলোপ বিষয়ে। স্বাক্ষরের জন্য সম্ভাব্য এমওইউগুলো হচ্ছে—দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, সংস্কৃতিবিনিময়, দুই দেশের মধ্যে ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা, দুই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইপিআরআই) মধ্যে সহযোগিতা।
ইসহাক দারের সম্মানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযুক্তি, কৃষি, নানা পর্যায়ে চলাচল সুগম করাসহ দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয় আলোচনায় থাকবে। পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে বৈঠকের ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হচ্ছে। এ বৈঠকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বোঝাপড়া ও অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ে জোর দেবে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগের সম্পর্ক যেখানে এসেছে, তা এগিয়ে নিতে হলে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সুরাহার কথা বলা হবে। বিশেষ করে একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন ও অবিভাজিত সম্পদে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রদান—ঐতিহাসিক এ তিন ইস্যুর সুরাহা চাইবে বাংলাদেশ। সফর শেষে আজ রাতেই পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপড়েন দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেও আওয়ামী লীগ সরকার দৃশ্যমান সাড়া দেয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
দীর্ঘ ১৫ বছর বিরতির পর গত এপ্রিলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পরপরই পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের কথা থাকলেও কাশ্মীর সংকটের কারণে সফরটি স্থগিত হয়েছিল।
ইসহাক দারের চলতি সফরটি গত দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশে পাকিস্তান থেকে মন্ত্রী পর্যায়ের তৃতীয় সফর। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান গত বুধবার ঢাকায় এসেছেন। এর আগে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।