মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

১৬৭ জনের মাথার খুলি ছিল না আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলিবিদ্ধ ৫৭৫ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে। এ ছাড়া ১৬৭ জনকে ভর্তি করা হয় এই হাসপাতালে যাদের বেশিরভাগের মাথার খুলি ছিল না। পাশাপাশি এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৯ আন্দোলনকারী মারা যান।গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দিতে এসে জবানবন্দিতে এসব তথ্য তুলে ধরেন ওই হাসপাতালের নিউরো ট্রমা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান। সাক্ষী দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসা না দিতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) লোকজন হাসপাতালের চিকিৎসকদের হুমকি ও চাপ দেয়।এদিন জুলাই অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষষ্ঠ কার্যদিবসে আরও তিন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত দুই বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আরও সাক্ষ্য দেন একই হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ পারভীন, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসানুল বান্না ও রাজধানীর চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে নিহত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শহীদ মেহেদী হাসান জুনায়েদের (১৪ বছর) মা সোনিয়া জামাল।

তিনি বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় বাম চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় জুনায়েদ। গুলি বাম চোখ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ওইদিন দুপুরে তিনি বাসায় গিয়ে ছেলের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পান। গতকাল পর্যন্ত মামলার আসামি শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ১৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলেন। পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী রবিবার দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচ অভিযোগে ৮১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

সাক্ষী মাহফুজুর রহমান বলেন, গত বছরের ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ওই হাসপাতালে প্রতিদিনই গুলিবিদ্ধ রোগী আসত। এই কয়েকদিন প্রথমদিকে শুধু হাতে, পায়ে, পিঠে ও গলায় গুলিবিদ্ধরা আসত। শেষের দিকে মাথায় গুলিবিদ্ধ রোগী আসত বেশি। তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ ৫৭৫ জনকে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। কারণ হাসপাতালে তখন গুলিবিদ্ধ রোগীর চাপ বেশি ছিল। যাদের বেশিরভাগের বয়স ১৩ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ ১৬৭ জনকে ভর্তি করা হয়, যারা গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাদের বেশিরভাগের মাথার খুলি ছিলনা। অনেকের মাথার মগজ ঝড়ে পড়ছিল। গুলিবিদ্ধ চার জনকে আনা হয়েছিল যারা স্পট ডেড ছিলেন। গুলিবিদ্ধ ২৯ জন নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে সাক্ষী মাহফুজুর রহমান জবানবন্দিতে বলেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে পুলিশের বাধা আসে উল্লেখ করে সাক্ষী বলেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধরা যখন আসছিল আমরা যাতে চিকিৎসা না দেই সেজন্য ডিবি থেকে লোকজন এসে আমাদের বলেছিল, ‘অতি উৎসাহী হইয়েন না। আপনি বিপদে পড়বেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এখানে যারা ভর্তি আছেন তাদের বিষয়ে ওপরের নির্দেশনা আছে। যারা ভর্তি আছেন তাদের ছাড়া যাবে না। তাদের ব্যাপারে আইনানুগ সিদ্ধান্ত আছে বলে জানায় ডিবির লোকেরা।’

তিনি বলেন, ‘ডিবির লোকজন বলে, গুলিবিদ্ধদের যেন ভর্তি না করা হয়, আর যাদের ভর্তি করা হয়েছে তাদের যেন ছুটি না দেওয়া হয়- এই বলে আমাদের হুমকি দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে আমরা গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসা দিতে এবং তাদের যাতে গ্রেপ্তার করা না হয়, সেজন্য কৌশল অবলম্বন করি। আহতদের সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণ লিপিবদ্ধ করে হাসপাতালে ভর্তি করি।’ সাক্ষী মাহফুজুর রহমান শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী এ আরাফাতকে হত্যাকা-ের জন্য দায়ী করে তাদের দৃশ্যমান ফাঁসির দাবি জানান।

সাক্ষী হাসানুল বান্না জবানবন্দিতে বলেন, ‘১৮ জুলাই থেকে আমরা চিকিৎসা শুরু করি। ওইদিন হাসপাতালে পুলিশ আসে। তারা চিকিৎসায় বাধা দেয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা এসে হাসপাতালের মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে চিকিৎসায় বাধা ও হুমকি দেয়। হুমকি ও ভয়ের মধ্যে আমাদেরকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।’

সাক্ষী সোনিয়া জামাল জবানবন্দিতে বলেন, ছেলে জুনায়েদ কোরআনে হাফেজ। ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নাশতা খেয়ে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিতে চানখাঁরপুল এলাকায় যায়। তিনি (সোনিয়া জামাল) নিজেও ওইদিন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে আন্দোলনে যোগ দেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার ছোটভাই মোবাইলে কল দেয়। জুনায়েদ মাথায় ব্যথা পেয়েছে তাই তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে বলে।

তিনি বলেন, তিনি বাসায় গিয়ে ছেলেকে বিছানায় শোয়া অবস্থায় দেখেন। একপর্যায়ে দেখতে পান গুলি জুনায়েদের বাম চোখের বামদিকে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বড় গর্ত করে বেরিয়ে যায়। জুনায়েদ আর বেঁচে নেই। ওই দিন ধূপখোলা মাঠে জানাজার পর জুনায়েদের লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ সময় বাম চোখে গুলিবিদ্ধ জুনায়েদের লাশের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। সাক্ষী সোনিয়া জামাল অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের সন্তানেরা তো নিরস্ত্র ছিল। তাদের কোনো দোষ ছিলনা। কেন তাদের গুলি করে মারল। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব।’

গতকাল সাক্ষ্যগ্রহণের সময় চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। ইতিমধ্যে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এ মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ার আরজি জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেছেন। গতকাল আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে  রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন সাক্ষীদের জেরা করেন।

গত ৩ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। গত ১২ মে শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর ১ জুন তিন আসামির বিরুদ্ধে দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ১৩টি ভলিউমে সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার নথি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। এরপর ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করলে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com