পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এছাড়া আরও ১০টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। গতকাল রোববার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, একনেকে ৭ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ের ১১টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় । এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১৭ কোটি টাকা, প্রকল্প ঋণ ২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৫৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কে তিনি বলেন, একনেকে অনুমোদন হলেও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করতে হবে। মূলত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে এই শর্ত দেওয়া হয়।রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৫১৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের মে মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বুড়ি পোতাজিয়ায় ১০০ একর জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আগে গত মে মাসে প্রকল্পটি পাসের একনেকে উঠেছিল, তখন তা আবার পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রকল্প এলাকাটি চারণভূমি ছিল। ২০১৮ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় অকৃষি জমি হিসেবে ছাড়পত্র দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণে অনাপত্তি সনদ দেয়। তখন বলা হয়েছিল, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নিতে হবে। এখন সেই শর্ত পূরণের শর্ত দিয়ে প্রকল্পটি পাস করা হয়। তিনি বলেন, এ নিয়ে পরিবেশবিদদের অনেক কথা আছে। এখন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। তারা পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করবে।একনেক বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি একনেকের তালিকায় চার নম্বরে ছিল। প্রকল্প প্রস্তাবনা সভায় উপস্থাপন করা হলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আপত্তি তোলেন। এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। পরিবেশ উপদেষ্টা নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। পরে কয়েকজন উপদেষ্টা বলেন, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে আপাতত একনেকে প্রকল্পটি পাস হোক। পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে দুই মাস বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যমান শিল্পসমৃদ্ধ এলাকায় ৩৩/১১ কেভি আউটডোর উপকেন্দ্র আধুনিকায়ন ও ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিএমআর অব কের অ্যান্ড কোং (বিডি) লিমিটেড প্রকল্প দ্বিতীয়বার সংশোধিত আকারে তোলা হচ্ছে। শিক্ষা খাতে রয়েছে-রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ স্থাপন প্রকল্প।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড পস্নাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন প্রকল্প প্রথম সংশোধিত আকারে সভায় অনুমোদন পেয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় ঢাকার আজিমপুর সরকারি কলোনির অভ্যন্তরে কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ (জোন-সি) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুলছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প।এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পলস্নী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো-ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই (তৃতীয় সংশোধিত) এবং বান্দরবান পৌরসভা ও জেলার তিন উপজেলা সদর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সমপ্রসারণ ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)।প্রকল্প অনুমোদনের পাশাপাশি আজকের একনেক সভায় আরও ৯টি অনুমোদিত প্রকল্প অবহিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে হাতিয়া দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ ও কুতুবদিয়া দ্বীপ শতভাগ নির্ভরযোগ্য ও টেকসই বিদ্যুতায়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত), রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে নেসকোর আওতাধীন এলাকায় স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন (প্রথম সংশোধিত) এবং বরগুনার দুটি পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এ ছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত), লাঙ্গলবন্দ মহাষ্টমী পূণ্যস্নান উৎসবের অবকাঠামো উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত), তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি (দ্বিতীয় সংশোধিত), সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত), কপোতাক্ষ নদ ও তৎসংলগ্ন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় (প্রথম সংশোধিত) এবং বিদ্যালয় বহির্ভূত কিশোর-কিশোরীদের জন্য দক্ষতা কেন্দ্রিক সাক্ষরতা (দ্বিতীয় সংশোধিত)।পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ঢাকা শহরে পরিশোধিত পানি সরবরাহ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। প্রকল্পটি চারবার সংশোধন করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসা সঠিকভাবে কাজ করছে না। এই প্রকল্পের অনিয়ম খুঁজে বের করা হবে। এখন থেকে প্রকল্পের কাজে ধীরগতির জন্য পেছনে কোনো অজুহাত মানবে না সরকার। সব মন্ত্রণালয়কে এই বার্তা দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, রাজধানীতে আরও দুটি মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পে বেশি অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এসব চুক্তি তো আগেই হয়ে গেছে। তারপরও খরচ কমাতে সরকার জাইকার সঙ্গে দরকষাকষি করছে।
তিনি জানান, বিদ্যুতের সিস্টেম লস কমানোসহ সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে একনেক বৈঠকে। এছাড়া রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনে ৫১৯ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এটা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য ভালো হবে।ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, জুলাই মাসে এক শতাংশেরও কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। এটি ইতিহাসে সর্বনি¤œ। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাই ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতেই সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি) জমা দিতে হবে। নির্বাচিত সরকার আসার আগেই বাজেটের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা চূড়ান্ত করতে হবে।