সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্র। যা সারা বাংলাদেশ এক নামে চিনে “সাদা পাথর পর্যটন”। ২০১৭ সালে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর কে পর্যটন স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়। তার পর থেকে দেশ ও দেশের বাহিয়ে এই নাম ছড়িয়ে গেছে বিদ্যুৎ গতিতে। মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের ঝর্ণাধারায় সাদা পাথরের উৎপত্তিস্থল। সাদা পাথর দেখতে অনেকটা ব-দ্বীপের মত। সাদা পাথর ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্ট নামেও পরিচিত৷ সাদা পাথর ধলাই নদী জিরো পয়েন্ট হতে রোপওয়ে(বাংকার) এর জন্য ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে আবার মিলিত হয়েছে। মনোলোভা ধলাই নদীর রূপ, সবুজ পাহাড়, সারা এলাকা জুড়ে অজস্র সাদা পাথর, আকাশের নীল ছায়া রেখে যায় পাথরে জমে থাকা স্ফটিক জলে। দূরের পাহাড়গুলোর উপর মেঘের ছড়াছড়ি, সাথে একটা দুটো ঝর্ণার গড়িয়ে পড়া। নদীর টলমলে হাঁটু পানির তলায় বালুর গালিচা। চিক চিক করা রূপালী বালু আর ছোট বড় সাদা অসংখ্য পাথর মিলে এ যেন এক পাথরের রাজ্য। প্রকৃতির খেয়ালে গড়া নিখুঁত ছবির মত সুন্দর এই জায়গাটির নাম ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর।
সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন স্পষ্ট সারা বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের অনেক দেশে ও এর পরিচিতি রয়েছে। ঝর্নার সচ্ছ জল ও রাশি রাশি সাদা পাথর দেখতে অনেক অপুর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এই পর্যটন স্পষ্ট এর কথা বললে সারা বাংলাদেশ চিনে থাকে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা না চিনলেও ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর নাম বললে প্রায় সবাই চিনে। সিলেট শহর থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে ধলাই নদীর উৎস মুখই ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর নামে পরিচিত।
সাদা পাথর লুটপাটঃ
গত ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের পর থেকে কয়েকশত কোটি টাকার পাথর ও বালু লুটপাট করা হয়েছে শুধু ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন এবং রোপওয়ে(বাংকার) এলাকা থেকে। আগে যেখানে সাদা পাথর ছাড়া কিছু দেখা যেত না সেখানে এখন শুধু বালুময় মরুভূমি। কয়েকদিন যাবত বালু নিয়ে যাচ্ছে সাদা পাথর থেকে। সাবল, কোদালের পাশাপাশি সেইভ(লিস্টার) মেশিন দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে লুটপাট করা হচ্ছে সাদা পাথর। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটন স্পষ্ট এর পূর্ব পাশে ছোট ছোট কয়েকশত গর্ত করে লুটপাট করা হচ্ছে সাদা পাথর। কিছু কিছু প্রভাবশালী আছে যারা বড় নৌকা(বালহেড) নিয়ে সাদা পাথর লুটপাট করে। স্থানীয় লোকজন অনেক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার নৌকা আটক করে। কিন্তু প্রভাশালী হওয়ায় আবার ছেড়ে দিতে ও দেখা যায়। সাদা পাথর লুটপাট এর ফলে ক্ষতবিক্ষত সাদা পাথর এলাকা। সাদা পাথর ও বালু অবৈধভাবে উত্তলন করা কোনো ভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। গত এক বছরে সাদা পাথর থেকে প্রায় ২ লক্ষ ঘনফুট পাথর লুটপাট করা হয়েছে যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০/২৫০ কোটি টাকা। সাদা এলাকা থেকে প্রায় ৬ লক্ষ ঘনফুট বালু লুটপাট করা হয়েছে যার বাজার মূল্য ২৪০ কোটি টাকার মত। অবৈধভাবে উত্তলন করে সাদা পাথর স্থানীয় দয়ার বাজার, কলাবাড়ি ও ভোলাগঞ্জ ১০নং ঘাটে কালেকশন করে বিভিন্ন ক্রাশার মেশিনে প্রেরণ করা হয়৷ আজ পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন কালেকশন ঘাটে কোনো অভিযান দেয় নি। তারা শুধু নদীতে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে। কয়েকদিন পর পর উপজেলা প্রশাসন অভিযান দিয়ে কয়েকজনকে আটক করে জেলে পাঠায়৷ সাদা পাথর লুটপাট বন্ধে স্থায়ীভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি এখন পর্যন্ত। এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও নিরব ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন প্রমাণ ও তথ্যসুত্রে দেখা যায়, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর লুটপাটে উপজেলা বিএনপি, জামাত ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতারা জড়িত। পাশাপাশি বিজিবি ও পুলিশ টাকার বিনিময়ে সবসময় নিরব ভূমিকা পালন করছে। সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় বিজিবির চারটি ক্যাম্প থাকলেও তাদের তেমন কোনো পদক্ষেপ নাই। সাদা পাথর পর্যটন ও রোপওয়ে(বাংকার) এলাকা ধ্বংসের পিছনে কোম্পানীগঞ্জ থানার ইউএনও আজিজুন্নাহার, কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ওজায়ের আল মাহমুদ আদনান, কালাসাদেক বিওপি কোম্পানি কমান্ডার কোনো ভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। ২০১৭ সালের পর থেকে সাদা পাথর পর্যটন এলাকা দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা প্রশাসনকে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন টিভি ও পত্রিকায় নিউজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত যে তারা টাকার বিনিময়ে সাদা পাথর ও রোপওয়ে(বাংকার) এলাকা ধ্বংসের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তারপরও উপজেলা প্রশাসন তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। স্থানীয় অনেক চাঁদাবাজদের কারণে সাদা পাথরের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এই সব চাঁদাবাজরা জায়গায় জায়গায় তাদের লোক দিয়ে রাখে। উপজেলা প্রশাসন অভিযানে যাওয়ার আগেই তারা খবর পেয়ে যায়। ফলে সকল পাথর লুটপাট কারীরা চলে আসে। আবার প্রশাসন চলে আসলে তারা টাকা নিয়ে সাদা পাথর লুটপাটের সুযোগ করে দেয়।
ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবিষয়ে উপজেলা প্রশাসন কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সাদা পাথর একালায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর এলাকায় বিজিবির ৪ টা ক্যাম্প আছে। চারটি ক্যাম্পই সাদা পাথর এলাকার ১ কিলোমিটার এর মধ্য আছে। বিজিবি কে কঠিনভাবে দ্বায়িত্ব পালনের আদেশ দিতে হবে। বিজিবির একটি ক্যাম্প একবারে সাদা পাথর পর্যটন স্পটে আছে। আরেকটা ক্যাম্প আছে কালাইরাগ। আরেকটি ক্যাম্প আছে ১০ং ঘাট। আরেকটি হচ্ছে কালাসাদেক বিওপি। বিজিবি যদি তাদের ডিউটি ঠিকভাবে পালন করে তাহলে একটি পাথর ও লুটপাট হবে না। পাশাপাশি যেখানে সাদা পাথর কালেকশন করে রাখা হয় সেই জায়গায় নিয়মিত অভিযান দিতে হবে। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন এলাকার ৫ একর জায়গা রেখে বাকী জায়গা ইজারা দিয়ে দেওয়া। ভোলাগঞ্জ বালু মহাল, ভোলাগঞ্জ পাথর মহালসহ বিভিন্ন গ্যাজেট ভুক্ত বালু ও পাথর মহাল লিজ দেওয়া৷ এতে করে সাধারণ শ্রমিকরা ইজারাকৃত জায়গা থেকে পাথর ও বালু উত্তলন করবে। পাশাপাশি এলাকায় মাইকিং করা৷ মানুষকে সচেতন করা। জনগণকে বুঝাতে হবে সাদা পাথর পর্যটনের গুরুত্ব। প্রয়োজনে এলাকায় যুব সমাজের কিছু অংশকে ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে৷
সাধারণত পর্যটন শিল্পের সাথে যারা জড়িত আছে তাদের কিছুটা লাভ হয়। সাদা পাথর পর্যটন সারা বাংলাদেশে চিনে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন মানুষ আসে। ফলে বিভিন্ন জায়গার সংস্কৃতি, ভাষা ও তাদের সম্পর্কে আইডিয়া হয়।
কসমেটিক ব্যবসায়ীঃ
দেশের যে-কোনো পর্যটন এলাকায় কসমেটিক আইটেম এর ব্যবসা ভালো হয়। তাই সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় অনেক কসমেটিক দোকানপাট হয়েছে। এতে করে কসমেটিক ব্যবসায়ী লাভবান হচ্ছে।
ফটোগ্রাফিঃ
যেকোনো পর্যটনের ন্যায় সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় ও ফটোগ্রাফি করা হয়। অনেকে সাদা পাথর পর্যটনে ফটোগ্রাফি করে অর্থ উপার্জন করছে। ১৫০+ ফটোগ্রাফার আছে সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রে।
সাদা পাথর পর্যটন স্পষ্ট এলাকা অনেক পর্যটক ভাল ভাবে চিনে না। তাই শহর থেকে অনেক গাইড নিয়ে আসে। এতে করে কিছু মানুষের ইনকাম হচ্ছে।
নৌকাঃ
ভোলাগঞ্জ ১০নং ঘাট থেকে নৌকায় করে সাদা পাথর পর্যটন স্পষ্ট এ যেতে হয়। ভোলাগঞ্জ ১০নং ঘাটে প্রায় ১৬০+ নৌকা আছে। প্রত্যেক নৌকায় একজন মাঝি ও একজন হেলপার থাকে। এতে করে নৌকা ভাড়ায় তাদের আয়ের একটা উৎস হয়েছে।
সাদা পাথর পর্যটনকে কেন্দ্র করে সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জ “সাদা পাথর পরিবহন” নামে বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। বিআরটিসি বাস ও চালু আছে। সাথে নতুন যোগ হয়েছে হিমাদ্রি নামে এসি বাস। যা সাদা পাথর পর্যটন টু সিলেট সার্ভিস দিচ্ছে। সাথে তো সিএনজি, অটোরিকশা সহ বিভিন্ন যানবাহন আছেই।
২০১৮ সাল থেকে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি বন্ধ রয়েছে। এতে করে সিলেট ভোলাগঞ্জ যত পাথর ব্যবসায়ী আছে সবায় এলসি পাথরের ব্যবসায় জড়িত হয়ে গেছে। কোটি কোটি টাকা ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ীর কাছে দেওয়া আছে। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকলে এলসি পাথরের দাম মোটামুটি ভালো থাকে। এতে করে এলসি ব্যবসায়ীরা মোটামুটি ভালো লাভবান হয়।
স্থানীয় পাথর উত্তলন বন্ধের কারণে এলসি পাথর রফতানি করা হচ্ছে। এতে করে দেশের টাকা বাহিরে চলে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে কমে যাচ্ছে। এতে করে তেমন কোনো রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।
সরকার/উপজেলা প্রশাসনঃ
২০১৭ সাল হতে বিভিন্ন বছর বিভিন্ন দামে সাদা পাথর পর্যটন ঘাট লিজ দিয়ে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে। ২/৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায় লিজ। এবার অবশ্য কোনো লিজ না দিয়ে উপজেলা প্রশাসন খাস কালেকশন করছে। প্রতি নৌকায় ৮ জন করে সাদা পাথর পর্যটন গেলে ভাড়া দিতে হয় ৮০০ টাকা। তা থেকে নৌকা মাঝিদের দেওয়া হয় ৩৫০ টাকা। বাকী ৪৫০ টাকা করে রাজস্ব পাচ্ছে সরকার/ উপজেলা প্রশাসন। মূলত উপজেলা প্রশাসন এই টাকা কালেকশন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়৷তাছাড়া ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ বিভিন্ন ভাবে কর্ম করে সাদা পাথর পর্যটনে আয়-রোজগার করছে। সারা বাংলাদেশে ও সাদা পাথর পর্যটন নামে সবাই চিনে থাকে। এতে করে ব্যবসা বানিজ্য সহ বিভিন্ন ভাবে লাভবান হচ্ছে এই এড়িয়ার মানুষ।
প্রশাসনঃ
স্বাভাবিকভাবেই যখন কোনো এলাকায় অবৈধ কোনো কাজ চলে এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের লাভ বেশি হয়। যেকোনো প্রশাসন অবৈধ ভাবে টাকা ইনকাম করতে পারে৷ সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় অবৈধ ভাবে পাথর ও বালু উত্তলন করতে হলে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে বড় বড় কিছু নেতা, পুলিশ, বিজিবি, চাঁদাবাজ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন।
অনেকেই মনে করে সাদা পাথর পর্যটন স্পষ্ট এর জন্য ভোলাগঞ্জ কোয়ারি লিজ দিচ্ছে না সরকার। কিন্তু সাদা পাথর পর্যটন এলাকা ছাড়াও ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির অনেক জায়গা রয়েছে। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি লিজ না দেওয়ায় সাধারণ শ্রমিক শ্রেণিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। যদিও ২০১৮ সালের পর থেকে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রথম দিকে সাদা পাথর পর্যটনের জন্যই বন্ধ রাখা হয় ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দাবি করেন সাদা পাথর পর্যটন এলাকা সংরক্ষণ করে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু করার জন্য। এর প্রেক্ষিতে ২০২০ সালে কোয়ারি লিজ দেওয়ার কথা থাকলেও ‘বেলা’র মামলায় কোয়ারি আর চালু হয় নি।
সাধারণ শ্রমিকঃ
ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু থাকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কাজ করতে পেরেছে সাধারণ শ্রমিক বা দিন মজুর। দৈনিক কাজ করে গেছে তাড়া। বারকি নৌকা দিয়ে পাথর উত্তলন করে ১৯৭১ সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে জীবিকা নির্বাহ করে সাধারণ শ্রমিক। কিন্তু পাথর কোয়ারি বন্ধের ফলে কর্মসংস্থান হারিয়ে অনেকে বিদেশ বা গার্মেন্টস এ কাজ নিচ্ছেন। এতে করে সাধারণ দিন মজুর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি।
ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু অবস্থায় অল্পপুজি নিয়ে অনেকে ব্যবসা করে গেছে। যেখানে এলসি ব্যবসা করতে গেলে ১/২ কোটি টাকা প্রয়োজন। সেখানে অল্পপুজি নিয়েও ব্যবসা করা গেছে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু অবস্থায়। এতে করে সাধারণ অল্পপুজি নিয়ে যারা ব্যবসা করেন তারা অনেক ক্ষতির মধ্যে আছে।
ছোট একটি টমটম মেশিন দিয়ে অনেকে পাথর ভাংগার কাজ করছে। আবার অনেক বড় ব্যবসায়ী বড় বড় ক্রাশার মিল প্রতিস্থাপন করে। অনেকে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ক্রাশার মিলের ব্যবসা শুরু করেন। কোয়ারি চালু থাকলে ক্রাশার মিল সবসময় চালু রাখতে পারত। এতে করে মোটামুটি ভালো ইনকাম ও আসত। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু থাকলে পাথরের ব্যবসায় কম পুজি লাগে। কিন্তু এলসি ব্যবসায় অনেক টাকা পুজি লাগে। তাই অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক লোন নিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু হবে আশায়।
পরিবহনঃ
পাথর কোয়ারি চালু থাকলে পরিবহন শ্রমিকরা অনেক বেশি পরিবহনের কাজ পায়। কিন্তু কোয়ারি চালু না থাকলে কাজ পায় না বললেই চলে। তাই অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। অনেকে পরিবহন মালিক দেউলিয়া হওয়ার পথে আছে।
বহিরাগত শ্রমিকঃ
পাথর কোয়ারি চালু থাকলে মোটামুটি বাংলাদেশের সকল জেলার মানুষ ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে কাজ করতে পারে৷ বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষ। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজার, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ইত্যাদি জেলার অনেক মানুষ সারা বছর ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে কাজ করত। কিন্তু কোয়ারি বন্ধ হওয়ার পর থেকে ভোলাগঞ্জ এলাকার মানুষ বিভিন্ন এলাকায় কাজের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ বিদেশ গেছে। কেউবা আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজের সন্ধানে ঘুরতেছে। কেউ হয়ত গার্মেন্টস কর্মী হচ্ছে।
এলসি পাথরঃ
ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু হলে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পরে এলসি পাথর যারা আমদানি করে তারা। প্রত্যেক এলসি ব্যবসায়ী ইন্ডিয়ায় প্রায় কয়েক কোটি করে টাকা ইনভেস্ট করা। যদি ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু থাকে তাহলে সারাদেশে এলসি পাথরের চাহিদা কমে যায়। ভোলাগঞ্জ বা অন্যান পাথর কোয়ারির পাথরের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে এলসি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও এখন বেশির ভাগ এলসি ব্যবসায়ী সাদা পাথরের ব্যবসায় জড়িত আছে।
রাজস্বঃ
ভোলাগঞ্জ বালুমহাল কিছু দিন আগে ইজারা হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকায়। আশা করা যায় যদি ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি ইজারা দেওয়ার হয় সরকার বছরে রাজস্ব পাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
পাথর আমদানিঃ
যদি ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিসহ দেশের সকল গ্যাজেট ভুক্ত পাথর কোয়ারি চালু করা হয় তাহলে দেশের রিজার্ভ অনেক বাড়বে। দেশের পাথর যদি দেশের কাজে লাগানো যায় তাহলে এলসি করে অন্য দেশ থেকে পাথর আমদানি করতে হবে না। দৈনিক ১০/১২ কোটি টাকা পাথর আমদানি করা হয় শুধু ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর দিয়ে। ২০২৩/২৪ অর্থবছরে শুধু তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা হয় ১৫০৯৯৫২ টন পাথর। যার ক্রয়মূল্য আসে প্রায় ৫ হাজার কোটি। সিলেট বিভাগে ১৩টি শুল্ক স্টেশন দিয়ে চুনাপাথর আমদানি করা হয়। এর মধ্যে গোয়াইনঘাটের তামাবিল, কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ, সুনামগঞ্জের বাগলি, বড়ছড়া ও চারাগাঁও; ছাতকের ইছামতী ও চেলা স্টেশন দিয়ে চুনাপাথর ও পাথর আমদানি হয়ে থাকে। এতে করে দেশের বড় অংকের টাকা বাহিরে চলে যাচ্ছে। যার ফলে দিন দিন রিজার্ভ ও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
এলসি ও সাদা পাথরের পার্থক্যঃ
এলসি বা চুনাপাথরঃ
মূলত এলসি বা চুনাপাথর একধরনের মাঠি। যা কঠিন শিলা নামে পরিচিত। চুনাপাথর মূলত আমদানি করা হত সিমেন্ট তৈরির জন্য। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তা আজ পাথর হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। যার পিএইচপি লেভেল খুবই দুর্বল। এমনি অনেক গবেষণায় দেখা গেছে চুনাপাথর দিয়ে তৈরি বাড়ি বা রাস্তাঘাটে লাগুন লাগলে তা আরো বেশি জলে উঠে। চুনাপাথরে তাপ দিলে এটি ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO) এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2))উৎপন্ন করে। ফলে চুনাপাথর আগুন নিবারক হিসেবে কাজ করে না।
সাদা পাথর বা ভোলাগঞ্জ পাথরঃ
এ ধরনের পাথর মূলত প্রাকৃতিক শিলা থেকে তৈরি। সাদা কালারের হওয়ায় স্থাপত্য নির্মাণের জন্য বেশ জনপ্রিয় সাদা পাথর। এই ধরনের পাথর খুব শক্তিশালী এবং টেকসই হয়ে থাকে। তাছাড়া, ভবন, রাস্তাঘাট, সেতু এবং অন্যান্য বৃহৎ নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত হয়ে থাকে। ভোলাগঞ্জ পাথর দেশের ভিতরের পাথর হওয়ায় সহজে পাওয়া যায়। দাম অনেকটা কম থাকে। বালু বা নুড়ি থেকে এই পাথর সৃষ্টি হওয়ায় এ পাথরের পিএইচপি লেভেল অনেক উচ্ছক্ষমতা সম্পন্ন হয়। আগে যখন কোনো সরকারি কাজের টেন্ডার দেওয়া হত তখন লেখা থাকত ভোলাগঞ্জি পাথর। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর কে “ধলাসোনা” বলে ডাকা হয়। ভোলাগঞ্জি পাথর প্রাকৃতিক কঠিন শিলা হওয়ায় আগুন নিবারক হিসেবে কাজ করে।
সাধারণ শ্রমিকসহ সকল পেশার মানুষের দাবি সাদা পাথর পর্যটন এড়িয়া রেখে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি চালু করে দেওয়া হোক। ধলাই নদীর উৎস মুখ থেকে ৫ একর জায়গায় জুরে সাদা পাথর পর্যটন স্পষ্ট। এই এলাকায় বাহিরে ও প্রচুর বালু এবং পাথর রয়েছে৷ যেহেতু অবৈধভাবে সকল পাথর উত্তলন হচ্ছে। এতে করে সরকারি কোষাগারে কোনো রাজস্ব জমা হচ্ছে না। যদি কোয়ারি লিজ দেওয়া হয় তাহলে সরকার রাজস্ব পাবে, পাশাপাশি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ২ লক্ষ মানুষ তার কর্মসংস্থান ফিরে পাবে। স্বাভাবিক ভাবে বৈধ ভাবে বালু ও পাথর উত্তলন করতে পারলে সাধারণ শ্রমিকরা সাদা পাথর লুটপাটে যাবে বলেও মন্তব্য করেছে অনেকে।