বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার অংশীদারি গভীর
করার অঙ্গীকার দুই দেশের সরকারপ্রধানের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে পুত্রজায়ার পার্দানা পুত্রা ভবনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এ সময় উভয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর ও কৌশলগত ভবিষ্যত্মুখী অংশীদারিতে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রথমে দুই নেতা একান্ত বৈঠক করেন। এর আগে সীমিতসংখ্যক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। পরে তারা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতা, নীল অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিস্তৃত পরিসরের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা করেন।প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনার শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক সহানুভূতির ভিত্তিতে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। মানবসম্পদ, বাণিজ্য ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অনন্য অংশীদার।’প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম অধ্যাপক ইউনূসকে ‘মালয়েশিয়ার বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা এবং গত এক বছরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁর প্রশংসা করেন। তিনি বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ, শিক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।একান্ত বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস প্রটোকল জটিলতার আওতায় আটকে পড়া আট হাজার বাংলাদেশি শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ প্রদান এবং মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালুর জন্য মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান। এতে শ্রমিকরা জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরে গিয়েও চাকরি হারানোর ঝুঁকি এড়াতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনায় আইন, বিচার ও প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মালয়েশিয়াকে সরকার-টু-সরকার কাঠামোর মাধ্যমে আরো বেশিসংখ্যক দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবী, যেমন—চিকিৎসক ও প্রকৌশলী নিয়োগের আহবান জানান।মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, বাংলাদেশি শ্রমিকরা এখন মালয়েশিয়ার শ্রমিকদের সমান সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন এবং বাংলা ভাষায় অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।বাংলাদেশ হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য ‘গ্র্যাজুয়েট পাস’ ভিসা চালুর অনুরোধ জানায়, যারা বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত।
মালয়েশিয়ায় আরো বাংলাদেশি কাজ করার সুযোগ পাবেন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আরো অধিকসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করার সুযোগ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।গতকাল কুয়ালালামপুরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং দুই দেশের মধ্যে পাঁটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং তিনটি সহযোগিতামূলক নোট বিনিময় স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন। কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।অধ্যাপক ইউনূসবলেন, ‘বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। তাঁরা উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠান, যা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জীবনযাপন, সন্তানের লেখাপড়া এবং ভালো শিক্ষাগ্রহণে সহায়তা করছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জন্য এই দরজা খোলা থাকবে এবং আমাদের দেশের আরো অধিকসংখ্যক তরুণ-তরুণী এখানে কাজ করার সুযোগ পাবেন।’বাংলাদেশের কর্মীদের মালয়েশিয়ায় কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার জনগণ তাঁদের সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্য এবং বন্ধুর মতো আচরণ করে। এতে তারা খুব খুশি। তারা অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি এখান থেকে অনেক কিছু শেখে, যা দেশে ফিরে যাওয়ার পর নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে সহায়ক হয়।’আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথাও জানান তিনি।প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং আসিয়ানের সদস্যপদ প্রাপ্তির জন্য মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন চান।সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আশা প্রকাশ করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার সম্পর্ক উভয় দেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে সহায়ক হবে।
মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহবান প্রধান উপদেষ্টার
মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহবান জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে ব্যবসাবান্ধব করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।গতকাল কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে আয়োজিত এক ব্যাবসায়িক ফোরামে প্রধান উপদেষ্টা এ আহবান জানান।প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে ব্যবসা আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। তবে নতুন বাংলাদেশে অনেক কিছুই নতুনভাবে গড়ে উঠছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্যবসার সম্ভাবনা।’তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্ভাব্য সব উপায়ে ব্যবসাবান্ধব হতে চেষ্টা করছে। আমি পরিবর্তিত বাংলাদেশে অসীম সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছি।’বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন। এতে তিনি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর তৈরি চাপ নিয়ে মালয়েশিয়া উদ্বিগ্ন
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে মালয়েশিয়া উদ্বিগ্ন।গতকাল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে পুত্রজায়ায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, আমরা অবশ্যই এতে উদ্বিগ্ন।’আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, মায়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অবশ্যই একটা বড় বিষয়। একই সঙ্গে দুর্ভোগে থাকা শরণার্থী ও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তাও প্রয়োজন।তিনি নিউইয়র্ক, কলকাতা ও মালয়েশিয়ায় বহুপক্ষীয় ফোরামে উদ্যোগ নেওয়ায় বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রশংসা করেন।তিনি জানান, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে একটি দল গঠন করে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মায়ানমার সফর করবেন। এর উদ্দেশ্য হলো সেখানে শান্তি নিশ্চিত করা এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংসতা চলছে, তার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা।