১৬ জুলাই রংপুরে আন্দোলনকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এর প্রতিবাদে সারা দেশে দিনভর ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়। এদিন আন্দোলনে ছয়জন ছাত্র শহীদ হন। দেয়াল বলে ওঠে, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়/বুক পেতেছি গুলি কর’। লেখা হয় আবু সাঈদের মায়ের আঞ্চলিক ভাষার বক্তব্য ‘হামার ব্যাটাক মারলু ক্যানে।’
অন্যদিকে নেট দুনিয়ায় নানা রকম কেরিক্যাচার আসতে থাকে। অনেকেই দুই বাহু ছড়ানো গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের নানা রকম আঁকা ছবি আপলোড করতে থাকেন। ১৭ জুলাই আবু সাঈদের অসাধারণ একটি সিঙ্গললাইন ড্রয়িং আপলোড করেন ভারতের শিল্পী কৌশিক সরকার। মুহূর্তের মধ্যে এই চিত্র ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায়। এই সময়ে ছাত্র হত্যার নানা বিষয় নিয়ে অসংখ্য কার্টুন হয়েছে। সেসব কার্টুন নেট দুনিযায় ছড়িয়ে পড়েছে।
২৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির ছয় সমন্বয়ককে হেফাজতে নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এমন প্রেক্ষাপটে সেদিন সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন কর্মসূচির ঘোষণা দেন অন্য তিনজন সমন্বয়ক। ছাত্রলীগ এই কর্মসূচি বানচালে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। তার পরও বুয়েট এলাকায় দেয়ালে সন্ধ্যায় কিছু গ্রাফিতি হয়েছে। গ্রাফিতি হয়েছে সারা দেশে। সেটাও সাংবাদিকদের চোখে পড়েছে পরের দিন। পত্রিকায় ছাপা হয়েছে রাজধানীর বাইরের গ্রাফিতির ছবি।
৩ আগস্ট সরকারের পদত্যাগের ৯ দফা আন্দোলন এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয় বাংলাদেশ। ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত হন শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ। এদিন সব চেয়ে বেশি গ্রাফিতি হয়েছে, যার চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে নানা দেয়াল ও মেট্রো রেলের পিলারে। সেদিন ঘোষণা দেওয়া হয় ৫ আগস্ট সারা দেশে যেসব এলাকায় আন্দোলনকারীরা নিহত হয়েছেন, সেখানে ‘শহীদ স্মৃতিফলক উন্মোচন’ এবং ৬ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। ৪ তারিখে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট তারিখটি পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। এদিনও সারা দেশের দেয়ালগুলোতে ব্যাপকভাবে গ্রাফিতি হয়েছে হাওয়াই ব্রাশে। ছাঁচের মাধ্যমে স্প্রে দিয়ে রং লাগিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শেখ হাসিনার ভয়াবহ মুখ।
ছাত্ররা বলেছিল জুলাইয়ের মধ্যেই হাসিনার পতন ঘটাবে। সে জন্য হাসিনার পতনের আগের সময়টুকু তারা জুলাই হিসেবেই গণ্য করে। তাই ৫ আগস্টকে তারা বলে ৩৬ জুলাই। ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাইয়ের দেয়ালে যে কাজ হয়েছে সেগুলোকে গ্রাফিতি বা চিকামারা বলা পুরাপুরি ঠিক হবে না। এগুলোকে দেয়ালচিত্র বলাই যুক্তিযুক্ত হবে। দেশজুড়ে দেয়ালগুলোকে তারা রাঙিয়ে তুলেছে। এঁকেছে-লিখেছে তারা লুকিয়ে নয়; প্রকাশ্যে, সবার সামনে, দিনের পর দিন সময় নিয়ে।
গণ-অভ্যুত্থানের চিত্রকলার বিষয়-বাণী বেশির ভাগই জুলাই আন্দোলন নিয়ে। যারা এঁকেছে, বেশিব ভাগই স্কুল-কলেজে পড়ুয়া তরুণ-তরুণী। এর মধ্যে তরুণীদেরই বেশি দেখা গেছে। তাদের চাওয়া-পাওয়া, না-পাওয়ার কথাগুলো দেয়ালে ফুটিয়ে তুলেছে। ফুটিয়ে তুলেছে ৩৬ দিনে তারা যা যা করেছে, তার বিবরণ। তাই বলে দেয়াল পেয়ে তার ওপর লিখে বা এঁকে দিয়ে চলে গেছে, এমন নয়। কয়েক দিনে রং লাগিয়ে প্রথমে চিত্রতল তৈরি করেছে। পরে তার ওপর এঁকেছে সুচিন্তিত ছবি। তার সঙ্গে লিখে দিয়েছে কথাগুলো। প্রতিটি ছবির বিশাল বিশাল ক্যানভাস। সেই ক্যানভাস তারা সহজেই অ্যারেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছে।
ছবিগুলো সহজজাত প্রবৃত্তি থেকে আঁকা। বেশির ভাগ ছবি ছয় ফুট বাই ছয় ফুট। এর চেয়ে বড় মাপের দেয়ালও আছে। সেই ক্যানভাস তারা অ্যারেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছে। বলে রাখা ভালো, এমন আকারের ক্যানভাস অ্যারেঞ্জ করতে পেশাদার শিল্পীরাও হিমশিম খান। রঙের ব্যবহারেও বৈচিত্র্য আছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কয়েকজন মিলে দল বেঁধে ছবি আঁকা শুরু করেছে। অনেক স্থানে দেখা গেছে, সন্তানরা ছবি আঁকছে, পাশেই মায়েরা বসে নজর রাখছেন। কোথাও এঁকেছে বন্ধুরা মিলে। সবাই মিলে প্রথমে কী আঁকবে সেটা পরিকল্পনা করেছে। তারপর পেন্সিল দিয়ে ড্রয়িং করে আঁকতে শুরু করেছে। কোনো ছবি কেউ একাই শেষ করেছে, কোনোটা অনেকে মিলে করেছে। সেভাবেই ছবির নিচে তাদের নাম লিখে দিয়েছে। কাজ দেখলেই বোঝা যায়, একাডেমির বাইরের শিল্পীদের কাজই বেশি। তবে এই খুদে শিল্পীরা একাডেমিক শিল্পীদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেনি, এমনটা বলা যাবে না। এই শিল্পধারা ইতিহাস হয়ে থাকবে।