জাতির উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া ভাষণে নির্দিষ্ট করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণাকে ‘ঐতিহাসিক’ অভিহিত করে একে স্বাগত জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বিএনপি মনে করে এই ঐতিহাসিক ঘোষণায় রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠবে এবং গণতন্ত্র উত্তরণের পথকে সুগম করছে। একই সঙ্গে বিএনপি আশা করে এই নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য করার জন্য সরকার, নির্বাচন কমিশন সকল ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। একটি কার্যকরী জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য বিএনপি সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে। এই নির্বাচনটা দেশের জনগণই চায়। জনগণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রহরি হয়ে দাঁড়াবে।গতকাল বুধবার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব আনুষ্ঠানিকভাবে দলের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের পরে রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরে সকালে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিএনপির মহাসচিব। তার সঙ্গে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ।মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ ১৬ বৎসর এই দেশের মানুষ গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য এক ভয়াবহ ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সংগ্রাম করেছে, প্রাণ দিয়েছে, শহীদ হয়েছে আহত হয়েছে, গুম হয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পরিকল্পিতভাবে এদেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে তিনটি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য করার জন্য সকল নির্যাতনমূলক পন্থা বেছে নিয়েছে। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রকে সেই লক্ষে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছে। অর্থনীতিকে লুট-পাট, বিদেশে টাকা পাচার, ব্যাংক লুট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। শেয়ার বাজার লুট, মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিএনপি শুরু থেকেই এর বিরোধীতা করেছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুনের মধ্য দিয়ে সেই সংগ্রাম ও আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছে। বিএনপির ৬০ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সকল শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় সাজা, নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মিথ্যা সাজানো মিথ্যা মামলায় ১০ বৎসর সাজা দিয়ে, ৬ বৎসর কারাগারে আটক করে রেখেছিল। তিনি ৫ আগস্ট মুক্তি পেয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ অনেক নেতাকে আজীবন কারাদ- প্রদান করে বিরোধী নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেছে। মৃত্যুদ- দিয়েছে, কারাগারেই অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে। বিএনপিকে নেতৃত্ব শুন্য করে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। নির্যাতিত, শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রতিটি নেতা-কর্মী লড়াই করেছে।তিনি বলেন, মানুষের সেই সংঘবদ্ধ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মধ্যে ৫ আগস্ট পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ফ্যসিস্ট হাসিনা। এই অভ্যুত্থানের ফলে মানুষের মনে নতুন আশা আবারো সৃষ্টি হয় এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে সরকার সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজনৈতিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তুলার লক্ষে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার প্রফেসর ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করেন। বিএনপি এই ঘোষণাপত্রকে স্বাগত জানায়। বিএনপি বিশ্বাস করে এই ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক দলগুলো যে অঙ্গীকার করেছে তা পালনের মধ্যদিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রূপান্তরের কাজ শুরু হবে। সুযোগ সৃষ্টি হবে একটি সাম্য, মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে সত্যিকারের প্রগতিশীল সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মানের প্রক্রিয়া। বিএনপি যে সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সকল স্তরের জনগণ এই সংগ্রামে অংশ নিয়েছে, শহীদ হয়েছে, আহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে তাদের জানাচ্ছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।বিএনপি মহাসচিব বলেন, লন্ডনে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসের বৈঠকে নির্বাচনের সময় ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারণের ঘোষণাকে স্বাগত জানাচ্ছে। বিএনপি মনে করে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা বাংলাদেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠবে এবং গণতন্ত্র উত্তরণের পথকে সুগম করছে।
তিনি বলেন, বিএনপি মনে করে এই নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। বিএনপি এই নির্বাচনকে সফল করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং একটি কার্যকরী জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে।ড. ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রফেসর ইউনূস নিশ্চয়ই এখন পর্যন্ত যতগুলো কাজ করে এসেছেন তাতে করে উনি প্রমাণ করেছেন যে, ভবিষ্যতেও তিনি নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ করার জন্য এমন কিছু করবেন না যা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।তারেক রহমান কবে আসবেন এমন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আমরা অপেক্ষায় আছি।জুলাই ঘোষণাপত্রের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ রয়ে গেলো কিনা জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, যে ঘোষণা প্রধান উপদেষ্টা দিয়েছেন জুলাই ঘোষণাপত্রে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ সংবিধানের যাবতীয় সংস্কার বা সংশোধনী বাস্তবায়ন করবে। এটাই আইনে ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এর বাইরে অন্য কোনো প্রক্রিয়ার কথা আমাদের জানা নেই। সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের আমাদের দীর্ঘ ধারাবাহিক আলোচনায় দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা শেষে যে সমস্ত বিষয়ে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো সনদ আকারে জাতীয় সনদ জুলাই-২০০২৫ এই নামে সেটা সংকলিত করে সকল পক্ষের স্বাক্ষরের জন্য প্রদান করা হবে। আমরা আগেই বলেছি যে, আমরা সেই স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত আছি। তবে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা পত্রে যেটা উল্লেখ করেছেন এটাই হচ্ছে বৈধ প্রক্রিয়া যে, নির্বাচিত সংসদ পরবর্তী সংসদে সাংবিধানিক সকল সংস্কার এগুলো পরিবর্তন করবে।নির্বাচনের ঘোষণায় কেউ কেউ হতাশ এবিষয়ে জানতে চাইলে সালাহ উদ্দিন বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া হয়ত তারা এখনো তারা দেয়নি, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হতাশার কথা তারা হয়েছে। তবে আমরা আশা করব তারা একটি পজেটিভ দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে এই গণতান্ত্রিক পথটাকে পরিস্কার করবে।