শেখ হাসিনার পতনের পর গুলি করা হয় সাক্ষীকে : সাক্ষ্যে ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন খোকন চন্দ্র বর্মণ। ২৩ বছর বয়সী খোকন পেশায় ড্রাইভার ছিলেন।নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টস কম্পানির গাড়ি চালাতেন। গত বছর ১৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তিনি প্রথম যোগ দেন। ১৯ জুলাইও সেখানে আন্দোলনে ছিলেন উল্লেখ করে সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘১৯ জুলাই সকালে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ভূঁইঘর (নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়) থেকে জালকুড়ি এলাকায় যাই। সেখান থেকে চাষাঢ়ার দিকে যেতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু যেতে পারি নাই। চাষাঢ়ার দিকে যাওয়ার পথে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে পুলিশ ও বিজিবি আমাদের গুলি করে। আমার সামনে এক ভাইয়ের বুকে গুলি লেগে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ওখানেই সে মারা যায়। আরো অনেকেই আহত-নিহত হয়। এর পরও আমি নিয়মিত আন্দোলনে যোগ দিয়েছি।’খোকন চন্দ্র বর্মণ বলেন, “গত বছর ৫ আগস্ট সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে সোনালি মার্কেট আমার বাসা থেকে আন্দোলনের জন্য সাইনবোর্ড এলাকায় আসি। আমরা অনেকক্ষণ স্লোগান দিই ও মিছিল করি। সেখান থেকে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিই। সেখানে বিজিবি ও পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। এরপর ছাত্র-জনতার সংখ্যা বেড়ে যায়। তখন বিজিবির সঙ্গে কথা বললে আমাদের ঢাকার দিকে যেতে দেয়। আমরা আন্দোলন করতে করতে যাত্রাবাড়ী পৌঁছলে দেখি, পুলিশ আমাদের ওপর গুলি করছে। তখন আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। সামনে না গিয়ে ‘স্বৈরাচার’ ও ‘ভুয়া’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলাম। দুপুর সাড়ে ১২টা হবে। আমরা যখন সামনের দিকে আগাই, তখন পুলিশ আবারও আমাদের ওপর গুলি করে।’গুলিতে একজনের মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির রক্তক্ষরণের বর্ণনা তুলে ধরে খোকন বলেন, ‘এমনভাবে রক্ত বের হচ্ছিল, যেন একটি গরুকে জবাই করা হয়েছে। ওই গুলিটি বের হয়ে আরেকজনের গায়ে লাগে এবং সেও আহত হয়। যার মাথায় গুলি লাগে সে তখনই মারা যায়।সেনাবাহিনীর ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে সাক্ষ্যে সাক্ষী বলেন, ‘তারপর সেখানে সেনাবাহিনী আসে। ফাঁকা গুলি করে এবং পুলিশদের চলে যেতে বলে। তারপর পুলিশ সদস্যরা যাত্রাবাড়ী থানায় চলে যান। এরপর আমরা সেখানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে স্লোগান দিতে থাকি। একপর্যায়ে খবর আসে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর যাত্রাবাড়ী থানা থেকে পুলিশ বের হয়ে আমাদের ওপর পাখির মতো গুলি করতে থাকে। আমরা যে যেখানে পারি নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। সেখানে আমিসহ বেশ কয়েকজন যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পিলারের পেছনে লুকাই।একপর্যায়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে আমাদের টার্গেট করে গুলি করে। সেখানে যারা ছিল, তাদের অধিকাংশের গায়ে গুলি লাগে এবং আমার হাত ও পায়ে গুলি লাগে। একপর্যায়ে আমি ফ্লাইওভারের নিচে থাকা ড্রামের পেছনে আশ্রয় নিই। সেখান থেকে একজন পুলিশ আমার মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি আমার চোখ, নাক ও মুখে লাগে।’ এ সময় মাস্ক খুলে সাক্ষী তাঁর মুখমণ্ডল ট্রাইব্যুনালকে দেখান। তাঁর বাঁ-চোখ, নাক ও মুখ পুরোটাই বিকৃত হয়ে গেছে।সাক্ষী খোকন বলেন, ‘গুলি লাগার পর আমি ছটফট করতে থাকি। আমার বাঁচার অবস্থা ছিল না। আমি হাত নাড়িয়ে মানুষের সাহায্য চাই। তারপর সেখানে ছাত্র ভাইয়েরা এসে আমার পকেট থেকে মোবাইল বের করে। আমি আমার মোবাইলের লক খুলে দিই। তারা আমার পরিবারকে জানায়। তারা আমাকে প্রথমে মুগদা মেডিক্যালে নিয়ে যায়। আমার অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যালে পাঠিয়ে দেয়। ঢাকা মেডিক্যালে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়ার পর মিরপুর ডেন্টা হাসপাতালে পাঠায়। সেখান থেকে আমাকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠায়। আমি এক মাস ছিলাম বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়াতে চিকিত্সার জন্য পাঠানো হয় আমাকে। চিকিত্সা নিয়ে সেখান থেকে এপ্রিল মাসে দেশে ফিরে আসি। ১২ আগস্ট আবার চিকিত্সার জন্য রাশিয়ায় যাব।’
সাক্ষ্যে এমন বর্ণনা তুলে ধরার পর খোকন চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘যারা হাজার হাজার মানুষ মেরেছে, জখম করেছে, সে জন্য শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশ প্রধান আইজিপি মামুন, কাউয়া কাদের (ওবায়দুল কাদের), শামীম ওসমান দায়ী এবং তাদের বিচার চাই আমি।’সাক্ষ্য গ্রহণের একপর্যায়ে খোকন চন্দ্র বর্মণের নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য ট্রাইব্যুনালের টিভি স্ক্রিনে দেখানো হয়। ভিডিওতে গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ব্যক্তিটি নিজে বলে দাবি করেন খোকন চন্দ্র বর্মণ।’এদিন ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয় চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে। পুরোটা সময় তাঁকে মনোযোগ দিয়ে বিচারকাজ দেখতে দেখা যায়। এই আসামি দোষ স্বীকার করে এই মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছেন।গত বছর ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়। সেই অভিযোগের তদন্ত শুরু হয় গত বছর ১৪ অক্টোবর। ছয় মাস ২৮ দিনে তদন্ত শেষ করে গত ১২ মে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। গত ১ জুন প্রসিকিউশন ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ দাখিল করলে তা আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে আত্মসমর্পণ করতে গত ১৬ জুন সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরের দিন সেই বিজ্ঞপ্তি দুটি জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয়। আসামিরা আত্মসমর্পণ না করায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। শুনানিতে প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে আমলে নেওয়া পাঁচ অভিযোগ তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালের কাছে অভিযোগ গঠন করার আরজি জানান। আর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিয়োজিত আইনজীবী মামলার অভিযোগ থেকে তাঁর মক্কেলদের অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। পরে গত ১০ জুলাই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
কণ্ঠ রোধ করার জন্য হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে : অ্যাটর্নি জেনারেল : অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবে ইতিহাসের যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, সে হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে এসে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আপনাদের সামনে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যেসব উপাদান আনা হবে, সেসব উপাদান আপনারা দেখবেন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে।’তিনি বলেন, ‘অতগুলো মানুষের জীবনের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি, এই বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারি, আপনারা ন্যায়বিচার করবেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা সব সময়ই সেই দাবি জানাব ট্রাইব্যুনালের কাছে।’
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশের মাটিতে খুন, গুম পলিটিক্যাল পারসিকিউশনের (রাজনৈতিক নিপীড়নের) একটা কালচার তৈরি হয়েছিল। বাহাত্তর (১৯৭২) থেকে পঁচাত্তর (১৯৭৫) পর্যন্ত আওয়ামী দুঃশাসন আমরা দেখেছি। যখন প্রায় ৩০ হাজার তরতাজা যুবককে হত্যা করা হয়েছিল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমরা মনে করি বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা দরকার, যে সমাজে খুনের রাজনীতি বন্ধ হবে।’তিনি বলেন, ‘গত ২৪ বছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যে রাজনীতি করা হয়েছে, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে খুন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গুম করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে দিনের ভোট রাতে করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে বিদেশে দেশের লাখ লাখ টাকা ডলার-পাউন্ড পাচার করে বেগমপাড়ায় বাড়ি বানানো।’অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জুলাই বিপ্লবের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। সব দাবির কণ্ঠ রোধ করার জন্য নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। দেশের ৩০ হাজারের মতো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ৩৬ দিনের গুলিতে। প্রায় দুই হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর পরও তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা হয়নি।’অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম স্বৈরাচারের জন্ম হয়নি। আমরা মনে করি, যদি স্বৈরাচারদের কোনো সমিতি করা হয়, তাহলে আজকে যাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, সে সেই সমিতির সভাপতি হতে পারে। হিটলারের গোয়েবলস যদি বেঁচে থাকতেন, হয়তো মিথ্যা কথা শেখার জন্য, মিথ্যা বলার জন্য, মিথ্যা সংস্কৃতি চালু করার জন্য বা এসব নিয়ে পিএইচডি করার জন্য উনি হয়তো এই স্বৈরাচারের কাছে আসতেন। সেই স্বৈরাচারের নাম শেখ হাসিনা ওয়াজেদ, যিনি আজকে আপনাদের (ট্রাইব্যুনালের বিচারক) সামনে একজন আসামি ছাড়া কিছুই নন।’তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ নেই। আমরা অপরাধের বিচারের জন্য আপনাদের কাছে এসেছি। আমরা এতটুকু বলতে চাই, আমরা ন্যায়বিচার চাই।’
এই বিচার অতীতের হিসাব-নিকাশ নয় : চিফ প্রসিকিউটর : সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনাল, এই বিচার প্রক্রিয়া শুধু একটি আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি জাতির আকাঙ্ক্ষা, পদদলিত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা এবং গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়া যে বাংলাদেশ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।’চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যত উঁচু পদেই আসীন হোক কিংবা তাঁর ছায়া যতই দীর্ঘ হোক না কেন, সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আমরা এই ট্রাইব্যুনালের কাছে নিবেদন করছি, অপরাধী যত বড়ই হোক, তার জন্য বিন্দুমাত্র ছাড় থাকবে না।’চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে ড্রোন, ফোনে আড়ি পাতা এবং লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিবাদকারীদের শনাক্ত করা হয় এবং দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো সশস্ত্র ক্যাডার নিয়োগ করে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করে। এসব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী দমন অভিযান, সহিংস হামলা চালায়। এসব কর্মকাণ্ড তত্কালীন ফ্যাসিবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে এবং তখনকার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।’