কিন্তু এই ধারণাটি বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। আন্তর্জাতিক সামরিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বহিঃরাষ্ট্র থেকে আমাদের সিজি-ও যে দূরত্ব, তাতে যেকোনো শত্রু যুদ্ধবিমান সীমান্ত অতিক্রম করে ঢাকায় পৌঁছতে পারবে পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যেই। অন্যদিকে দূরবর্তী ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত হয়ে আকাশে উঠতে কমপক্ষে দুই থেকে চার মিনিট লাগে এবং এরপর টার্গেটে পৌঁছতে আরো সময় প্রয়োজন হয়। এই সময়সীমায় শত্রু আক্রমণ করে চলে যেতে পারবে আর আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থা তখনো প্রস্তুতই হতে পারবে না। তাই প্রতিরোধ করতে হলে রাজধানীর আশপাশেই কুইক রি-অ্যাকশন অ্যালার্ট (কিউআরএ) প্রস্তুতি থাকা অপরিহার্য।এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় যুদ্ধবিমান ঘাঁটি রাখা এবং পরিচালনা শুধু যুক্তিযুক্ত নয়, বরং জরুরি। এর চেয়েও বড় যে কারণটি অনেকেই উপেক্ষা করেন—ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ একটি অদ্ভুত ভৌগোলিক বাস্তবতায় ঘেরা। আমাদের প্রতিরক্ষা গভীরতা (ডিফেন্স ইন ডেপথ) সীমিত। ফলে একবার সীমান্ত পেরিয়ে শত্রু ঢুকে পড়লে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছতে সময় লাগে না। তাই শত্রুকে ঠেকাতে রাজধানীর কাছেই বিমানবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি অপরিহার্য।এই বাস্তবতায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, দুর্ঘটনায় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায় কার? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সবার জানা দরকার। কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির রানওয়ে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গেই যৌথভাবে ব্যবহৃত। রানওয়ের শেষ সীমা থেকে যেসব বসতি, স্কুল, হাসপাতাল, হোটেল বা আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে, তা গড়ে উঠেছে বেসরকারি দখল, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে। বিশ্বজুড়ে যেকোনো বিমানবন্দরের পাশে অ্যাপ্রচ জোন নামক এলাকা থাকে, যেখানে স্থায়ী বসতি বা জনবসতি গড়ে তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি আন্তর্জাতিক উড্ডয়ন নিরাপত্তা নীতিমালার অংশ। কিন্তু ঢাকায় এই নিয়ম মানা হয়নি। যখন কুর্মিটোলা ঘাঁটি বা বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছিল, তখন পুরো এলাকা ছিল নির্জন। ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে উঠেছে এবং বিস্ময়করভাবে রাজউক, সিটি করপোরেশন কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক চাপে ঘাঁটির ঠিক সীমানা ঘেঁষেই উঁচু বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর জন্য দায়ী দেশের দীর্ঘদিনের দুর্বল নগর পরিকল্পনা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা। এই সিদ্ধান্তগুলোর দায় কখনোই বিমানবাহিনী বা ঘাঁটির নয়।বিভিন্ন দেশে কিভাবে সামরিক বাহিনীর অবস্থান নির্ধারিত হয়, তা বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে যেমন পেন্টাগন অবস্থিত, তেমনি চীন তাদের রাজধানী বেইজিংয়ের মধ্যে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইউনিট। রাশিয়ার মস্কো, ভারতের দিল্লি, পাকিস্তানের ইসলামাবাদ কিংবা ইসরায়েলের তেল আবিব—সব রাজধানীতেই রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি।ভারতের দিল্লিতে রয়েছে হিন্দন এয়ার বেইস, সিটি সেন্টার থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। আমেরিকার জয়েন্ট বেইস এসডিউস অবস্থিত ওয়াশিংটন ডিসির কাছেই। লন্ডন, প্যারিস, তেল আবিব—সব বড় শহরের পাশে সামরিক বিমানঘাঁটি বিদ্যমান। কারণ রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু যেকোনো সময়ই শত্রুর প্রথম হামলার লক্ষ্যবস্তু। আর প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সেনাবাহিনী বা বিমানবাহিনীকে থাকতে হয় রাজধানীর আশপাশেই।আধুনিক সমরবিদ্যায় ও অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, রাজধানীর প্রতিরক্ষায় বিমানবাহিনীর ভূমিকাই মুখ্য। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমেই ইরাকের রাজধানী বাগদাদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। কারণ বাগদাদের পতন মানেই ছিল ইরাকের শাসনব্যবস্থার পতন। আবার ২০০৩ সালে দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধেও দেখা গেছে, ‘বাগদাদ ফাস্ট’ কৌশলেই মার্কিন বাহিনী এগিয়েছে।