সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের বিষয়ে প্রথম পর্বের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৬২টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আলোচনা শেষে ওই সব প্রস্তাবের ওপর সম্মতি প্রকাশ করা হয়েছে।
কমিশন সূত্র জানায়, কমিশনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১৬৬টি প্রস্তাবে সংবিধান সংস্কারই ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়। এতে ৩০টি দলের সম্মতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) ও উচ্চকক্ষ (সিনেট) নিয়ে গঠিত হবে।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অধীন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতাভুক্ত করা হবে। আর বিচার বিভাগ সংস্কারে আপিল বিভাগের বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান বিচারপতির চাহিদা মোতাবেক বিচারক নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে।বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীন এবং বিচারকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথক করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়া একটি স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস ও স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণয়ন করা হবে। বিচারকদের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হবে।
জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়ে জুলাই অভ্যুত্থানকালে গণহত্যা ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়ে ৩২টি দল একমত হয়েছে। একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন এবং তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ সংশোধন করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠন ও স্বতন্ত্র ভূমি আদালত স্থাপনের বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একটি দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন ও বৈধ উৎসবিহীন আয়কে বৈধতা দানের চর্চা চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হবে। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে আইন প্রণয়ন এবং নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। দুদক কমিশনারের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচে উন্নীত করা, তাঁদের মেয়াদ পাঁচ বছরের পরিবর্তে চার বছর নির্ধারণ এবং বাছাই কমিটির নাম ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’তে পরিবর্তন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কমিটি সাত সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করবে। দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ৩২(ক) বিলুপ্ত করে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়ার বিধান বাতিল করা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের (ওজিপি) পক্ষভুক্ত হবে।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক পর্য়ায়ের প্রস্তাবিত ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য হয়েছিল, সেই আলোচিত ইস্যুগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সংলাপে উত্থাপনের পর ওই সব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।