প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় ও যমুনা সংলগ্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং সচিবালয়ে সাধারণ দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধ থাকবে বলে গত ২৬ মে মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি করা হয়েছিল।সেই দিনেই ডিএমপির পক্ষ থেকে সচিবালয় ও যমুনা সংলগ্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়। তারপরও শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষাসচিবের পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপে আহত ৮০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। গত রাত পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও ভোররাত পৌনে ৩টার দিকে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জানান, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর পরও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয়ের সামনে অবস্থান নেন এবং এক পর্যায়ে তারা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গেট ভেঙে সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। তারা সচিবালয়ের ভেতরে থাকা গাড়ি ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় সেখানে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করলে শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের বাইরে চলে যান। তখন সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার শব্দ শোনা গেছে। এ ছাড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়া হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে সচিবালয়ের ভেতরে সরকারি কাজে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এবং দায়িত্বরত সেনাবাহিনীর সদস্য ও পুলিশ সদস্যরা অনেকই আহত হয়েছেন। এদিকে সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে ১০ থেকে ১৫টি সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করেছে ছাত্ররা। সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ও সচিবরা ভেতরে থাকার পরও কিভাবে এমন ঘটনা প্রশাসনের ভেতরে ঘটছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক কর্মচারী। তাদের মতে, সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা রয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবসহ অনেক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন বলে জানিয়েছেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হয় যান চলাচল। এদিকে সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশের পাশাপাশি র্যাবের একটি টিম সচিবালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া সচিবালয়ে আটকেপড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীও একে একে বের হন।তার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জনপ্রশাসন-বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব মাহফুজ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন। তারপরও কেন সচিবালয়ে বাইরে আন্দোলন? এটি আসলে কি আন্দোলন না সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায় ফ্যাসিবাদী চক্র। তা খতিয়ে দেখার সরকার বলে মনে করছেন সচিবালয়ের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।গতকাল বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে সচিবালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় তারা শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার শব্দ শোনা যায়। এ ছাড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়া হয়েছে। সচিবালয়ে এমন ঘটনা ৫০ বছরেও দেখিনি বলে জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররা সভা-সমাবেশ এবং প্রতিবাদ মিছিল ও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে কিন্তু সচিবালয়ে ভেতরে প্রবেশ করে হামলা করার ঘটনা এটি একটি বিরল। এ সমাবেশে যারা এসেছেন তাদের ছাত্রের চেয়ে অছাত্র বেশি দেখা গেছে। কারণ ছাত্ররা এভাবে ক্ষতি করতে পারে না। সচিবালয়ে যারা প্রবেশ করেছে তাদের বেশির ভাগই ভ্যানচালক ও গুলিস্তানের হকার ছিল। তা না হলে কাঠের লাঠিসোটা কিভাবে এলো। বিক্ষোভের জেরে সচিবালয়ের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে সচিবালয়ের সামনের সড়ক হয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।আহত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী সচিবালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিল। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে, এতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়।সরেজমিন দেখা গেছে, গতকাল দুপুর সোয়া ২টা থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে মিছিল বের করে সচিবালয় এলাকায় অবস্থান নেয়। পরে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তারা প্রধান ফটক অতিক্রম করে সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের ৭ ও ৮ নম্বর ভবনের সামনে রাখা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের সচিবালয় এলাকা থেকে সরিয়ে দেন। সচিবালয়ে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগান দিতে থাকেন। পরে সচিবালয় থেকে বের হয়ে তারা ইট-পাটকেল ছোড়েন। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তারা সচিবালয় এলাকায় অবস্থান করছিল। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ভবন থেকে মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের সামনে এলে তখন সচিবালয়ের সব কয়টি গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময় সচিবালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। ‘আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব দে’ স্লোগান দিতে থাকেন তারা। সচিবালয়ের ভেতরে গেটগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়ে আছেন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন, সোমবার মাইলস্টোনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটল। শিক্ষা উপদেষ্টাকে বিভিন্ন মহল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানানো হয়েছিল। তিনি কথা শোনেননি। রাত ৩টায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সে সময় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। উনি কার জন্য শিক্ষা উপদেষ্টা? আমরাই তাকে বসিয়েছি, আমরাই তাকে ওঠাব। এছাড়া শিক্ষার্থীদের একটি দল ঢাকা বোর্ড হয়ে সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। গত এসএসসি পরীক্ষায় যারা ফেল করেছে তাদের পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানায় তারা।এদিকে সচিবালয়ে এভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন। সন্দেহ জেগেছে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সচিব এই বিষয়ে ইনকিলাবকে বলেন, সচিবালয়ের ভেতরে এভাবে আন্দোলনতরা কিভাবে প্রবেশ করল, আর তারা যে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে সেই বিষয়ে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য থাকা উচিত। তারপরও যেটি ঘটেছে, সেটি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতাই বলা যায়।উল্লেখ্য, গত ২৬ মে রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবালয় নিরাপত্তা শাখার উপসচিব আবদুল্যাহ আল জাবেদের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অনিবার্য কারণবশত গত ২৭ মে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সব ধরনের দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধ থাকবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। নির্দেশনায় বলা হয়, গত ১০ মে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার কর্তৃক জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি মোতাবেক বাংলাদেশ সচিবালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত, মিছিল ও শোভাযাত্রা ইত্যাদি নিষিদ্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এসব নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি। সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রত্যাহারের দাবিতে গত ২৭ মে সচিবালয়ে আবারো বিক্ষোভ মিছিল করবেÑ এ ঘোষণায় দিয়েছিল বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরাম। পাশাপাশি একই ধরনের কর্মসূচি পালনের জন্য সচিবালয়ের বাইরে সারা দেশের সরকারি দফতরের কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানায় সংগঠনটি। তৃতীয় দিনের মতো সচিবালয়ের ভেতর বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা।এদিকে রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ছয়টি দাবির প্রত্যেকটিই যৌক্তিক বলে মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরা হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মঙ্গলবার দুপুরে উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেন শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ বিষয়ে সচিবালয়ে নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পরে কথা হবে।