তাওবা এটি এক শক্তিশালী আশ্রয়স্থল, এক অটল দুর্গ, যেখানে পাপী ব্যক্তি আশ্রয় নিতে পারে। সে যদি নিজের অপরাধ স্বীকার করে, অন্তরের গভীর থেকে অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে আর গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করে, তবে আল্লাহ তার পাপ মোচন করেন এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
এই প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) আমাদের জন্য এক অনন্য গল্প বর্ণনা করেছেন এক ব্যক্তি, যিনি জীবনে অপরাধের স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন, তিনি একশো জন মানুষকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু একদিন তিনি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন। তখন আল্লাহ পরম দয়ায় তাঁর তাওবা কবুল করেন। এমনই এক ব্যক্তির গল্প বিস্তারিত নিম্নে হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হলো-
আবু সাঈদ আল খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী করিম (সা.) বলেছেন, বনি ইসরাঈলের এমন এক ব্যক্তি ছিল, যে ৯৯জন মানুষ হত্যা করেছিল। অতঃপর বের হয়ে একজন পাদরিকে জিজ্ঞেস করল, আমার তওবা কবুল হবার আশা আছে কি? পাদরি বলল, না। তখন সে পাদরিকেও হত্যা করল। অতঃপর পুনরায় সে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল। তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি অমুক স্থানে চলে যাও। সে রওয়ানা হল এবং পথিমধ্যে তার মৃতু্য এসে গেল।
সে তার বক্ষদেশ দ্বারা সে স্থানটির দিকে ঘুরে গেল। মৃত্যুর পর রহমত ও আযাবের ফেরেশতামণ্ডলী তার রূহকে নিয়ে বাদানুবাদে লপ্তি হলেন। আল্লাহ সামনের ভূমিকে আদেশ করলেন, তুমি মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী হয়ে যাও। এবং পশ্চাতে ফেলে স্থানকে (যেখানে হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল) আদেশ দিলেন, তুমি দূরে সরে যাও। অতঃপর ফেরেশতাদের উভয় দলকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা এখান থেকে উভয় দিকের দূরত্ব পরিমাপ কর। পরিমাপ করা হলো, দেখা গেল যে মৃত লোকটি সামনের দিকে এক বিঘত বেশি এগিয়ে আছে। কাজেই তাকে ক্ষমা করা হল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৭০)
ঘটনা থেকে শিক্ষা
১. আল্লাহর করুণার বিশালতা: আল্লাহ তাঁর অপরিসীম দয়ায় অনুতপ্ত বান্দার তওবা কবুল করেন, যত পাপই সে করে থাকুক না কেন। সুতরাং যারা আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে চেনে না, তঁার অনন্ত করুণা সম্পর্কে অজ্ঞ।
২. হত্যাকারীর তাওবা কবুল হয় : একজন খুনির তওবা যদি খাঁটি হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মুশরিক, হত্যাকারী ও ব্যভিচারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা সত্ত্বেও যদি তারা তাওবা করে ও সত্কর্মে মনোযোগী হয়, তবে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন। তবে দুনিয়ার আদালতে অপরাধী সাব্যস্ত হলে তার বিচার হতে পারে।
৩. সকল পাপ, শিরক ছাড়া ক্ষমার যোগ্য: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, শিরক ছাড়া সকল পাপ আল্লাহর ইচ্ছায় ক্ষমার যোগ্য।
৪. তাওবার পথ দেখানো আলেমের দায়িত্ব: একজন আলেমের দায়িত্ব হলো তাওবাকারীকে এমন পথনির্দেশ দেওয়া, যা তার ঈমানকে সুদৃঢ় করবে এবং তাকে পূর্ববর্তী পাপের জীবন থেকে মুক্তি দেবে।
৫. আলেম ও সাধারণ ইবাদতকারীর মধ্যে পার্থক্য: এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, একজন প্রকৃত আলেম ইলমের আলোকে সঠিক ফতোয়া দেন, আর শুধুমাত্র ইবাদতে লপ্তি ব্যক্তি জ্ঞানের অভাবে ভুল ফতোয়া দিতে পারে।
৬. জান কবজে দুই শ্রেণির ফেরেশতা: আল্লাহ বিশেষ ফেরেশতাদের নিয়োজিত করেছেন যারা মুমিনদের আত্মা কবজ করেন; এরা ‘রহমতের ফেরেশতা’ নামে পরিচিত। আর কাফের ও পাপিষ্ঠদের আত্মা যারা কবজ করেন, তারা ‘আযাবের ফেরেশতা’।
৭. বিচারকের দায়িত্ব ছাড়া শাস্তি প্রয়োগ করা অনুচিত: যে ব্যক্তি বিচারপতি নয়, তার জন্য নিজ দায়িত্বে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়। যেমন, এখানে আলেম ব্যক্তিটি স্বীকারোক্তি শোনার পরও খুনিকে বন্দি করেননি বা কোনো বিচার পরিচালনা করেননি; বরং তিনি তাকে তওবা ও সংশোধনের পথ দেখিয়েছেন।
এই কাহিনির মাধ্যমে বোঝা যায়, আল্লাহর করুণা অসীম, খাঁটি তওবা দ্বারা যে কেউ তাঁর অনুগ্রহ লাভ করতে পারে এবং একজন প্রকৃত আলেমের দায়িত্ব হলো মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া, যা তাদের ইহকাল ও পরকালে মুক্তির পথে পরিচালিত করবে।