সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শিক্ষার বৈশম্য দূর

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে

শিক্ষা সুযোগ নয়, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে শিক্ষাকে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র সর্বজনীন, গণমুখী, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য আইন প্রণয়ন করবে। শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনা এবং জনগণের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিকতাবোধ তৈরি করার চেষ্টা করা হবে। সমাজের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং সেই অনুযায়ী উপযুক্ত নাগরিক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এছাড়াও, সংবিধানের ১৪ ও ১৮ নং অনুচ্ছেদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যদিও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, তথাপি শিক্ষার গুণগত মান এবং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড়ো ধরনের পার্থক্য রয়েছে।সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজের মধ্যে শিক্ষার মান, সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ঠিক একইভাবে গ্রাম ও শহরের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শুধু কী তাই? জেলা শহরের শিক্ষার মান, সুযোগ-সুবিধার সাথে বিভাগীয় শহর এবং রাজধানী শহরের শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণি থেকেই হরেক রকমের শিক্ষাব্যবস্থা এবং হরেক পরীক্ষা চালু আছে। দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ১১ রকমের স্কুল, পাঁচ ধরনের কারিকুলাম রয়েছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় এসএসসি বা সমমানের সনদের জন্য ১০ রকমের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আছে প্রচলিত বা সাধারণ স্কুলগুলোতে যারা পড়ালেখা করে তারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে থাকে। এসএসসি পরীক্ষায় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমেও অংশগ্রহণ করা যায়। আবার প্রাইভেটেও এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইংরেজি ভার্সনেও এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া যায়। যারা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে তাদের এসএসসি’র সমমানের পরীক্ষার নাম ‘ও’ লেভেল। সে ব্যবস্থাতেও এডেক্সেল এবং কেমব্রিজ কারিকুলামের মাধ্যমে দুই ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। আর যারা আলিয়া মাদরাসায় পড়ে তাদের জন্য দাখিল পরীক্ষা। দাখিল ভোকেশনাল নামেও একটি পরীক্ষা আছে। কারিগরিতে যারা পড়ে তাদের জন্য এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষা। কওমি মাদরাসার জন্য আছে পৃথক সিলেবাসে পরীক্ষা ব্যবস্থা।সভ্যতা, জাতীয় উন্নয়ন এবং উন্নতির মূল চাবিকাঠিই হলো বৈষম্যহীন শিক্ষা। শিক্ষায় যে জাতি যত বেশি বৈষম্য করেছে, সেই জাতি জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতায় ততো বেশি পিছিয়ে পড়েছে। একটি উন্নত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে মান সম্পন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক মানবিক শিক্ষার বিকল্প নেই। অথচ আমরা হাঁটছি উল্টো দিকে। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা বহু ধারায় বিভক্ত। শিক্ষার সুযোগ সুবিধা এবং অবকাঠামোর ক্ষেত্রে গ্রাম এবং শহরের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ধনী গরিবের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সুবিধার বৈষম্য আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ধনীরা অনেক এগিয়ে আছে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা অর্থ এবং সচেতনতার অভাবে এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে।গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষক সংকট প্রকট। উন্নত জীবন এবং ভবিষ্যতের বিষয়গুলো বিবেচনা করে শিক্ষকরা গ্রামে থাকতে চান না। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার মানে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। এর প্রভাব দিনদিন স্পষ্ট হচ্ছে।গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী এ বছর সারা দেশে ৩০ হাজার ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ছাত্রী ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন এবং ছাত্র ৯ লাখ ৬১ হাজার ২৩১ জন। পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ শিক্ষার্থী। গড় পাশের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা গতবার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এবার ফলাফল সা¤প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হয়েছে। এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন পরীক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। গতবারের চেয়ে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৩টি বেড়েছে। গতবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান ছিল ৫১টি। এই ১৩৪টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই গ্রামের।

শিক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শিক্ষা এখন ব্যবসায়ে রূপান্তারিত হয়েছে। সমাজের উচ্চবিত্তরা প্রচুর অর্থ ব্যয়ে তাদের সন্তানদের মান সম্পন্ন বেসরকারি স্কুলে পড়াচ্ছেন এবং আধুনিক সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে সমাজে দ্রæতই প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন। অন্যদিকে অর্থ ও সচেতনতার অভাবে সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তাদের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছেনা। ফলে দরিদ্ররা ,দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। আর্থসামাজিক কারণে আমাদের অনেক শিশুই প্রাথমিক স্কুলের গÐি পার করতে পারছে না। অধিকাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা সরকারি উপবৃত্তি পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হয়। প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার নিয়ম বা বিধান থাকলেও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে তা মানা সম্ভব হচ্ছে না। পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের হার ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি। ইউসেফ ও ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ১৭ শতাংশ শিশু স্কুলের বাইরে রয়ে গেছে। এর তুলনায় ভারতে এই হার প্রায় ১২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় মাত্র ৪ শতাংশ।আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করছে, যা সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত বা নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা ধনী পরিবারের সন্তানদের সাথে শিক্ষা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। ঢাকায় বেসরকারি সাধারণ বিদ্যালয়ে কিংবা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের তুলনায় সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক কম ব্যয়বহুল। কিন্তু প্রশ্নটা শিক্ষার মান নিয়ে। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় বিনা বেতনে শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব। বেসরকারি মানসম্পন্ন বিদ্যালয়ের খরচের ভার বহন করা অনেক অভিভাবকের পক্ষেই সম্ভব না। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এতসব খরচের জোগান দিতে পুরোপুরি অসমর্থ। ঢাকা মহানগরে সরকারি বিদ্যালয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রয়েছে বেসরকারি কিংবা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়। এজন্য আর্থিকভাবে অসচ্ছল অভিভাবকরা তাদের সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে সব সময় সমস্যার মধ্যে থাকে। শিক্ষা উপকরণের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। ‘টাকা যার ,শিক্ষা তার’ এই নীতিতেই চলছে এখন। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈরাজ্য ও বৈষম্যের অভিযোগ পুরোনো। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই নীতির পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে।শিক্ষায় বৈষম্যের নেতিবাচক দিকগুলো সমাজ ও দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কার ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে, শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত করতে হবে। আধুনিক বাংলাদেশকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com