সংস্কার, জুলাই সনদ ও নির্বাচন—এই তিন বিষয় দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, আমরা একটা সুযোগ পেয়েছি নতুন করে বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা দেখছি, যত দিন যাচ্ছে, পরিস্থিতি যেন জটিল হয়ে উঠছে।’
গতকাল শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে ‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ’ শীর্ষক আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন। গণতন্ত্র মঞ্চ সভার আয়োজন করে।
গতকাল রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ মিলনায়তনে অন্য এক অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল। জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারদের নিয়ে এ আলোচনা অনুষ্ঠানে একজন শহীদ মাতার বক্তব্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিএনপির মহাসচিব।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যত দিন যাচ্ছে, ততই যারা গণতন্ত্র বিশ্বাস করে না, জনগণের অগ্রযাত্রায় বিশ্বাস করে না, একটা শোষণহীন সমাজ গড়ে তোলার রাজনীতি বিশ্বাস করে না, তারা আবার জোট পাকাচ্ছে। যে ফ্যাসিস্ট, যাকে আমরা বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছিলাম, তারা ভেতরে-ভেতরে আবার সংগঠিত হচ্ছে।
ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এ জন্য সংস্কার, জুলাই সনদ ও নির্বাচন—এই তিন বিষয়কে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে নিন। অযথা বিলম্ব সৃষ্টি না করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলুন। কথা বলে সেই সমস্যা শেষ করে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যান, সেটাই বোধহয় একমাত্র পথ।
তিনি বলেন, ‘দায়িত্বটা নিঃসন্দেহে এই অন্তর্বর্তী সরকারের। আমরা খুব আশাবাদী যে, সরকারের যিনি নেতা, তিনি হচ্ছেন এ দেশের একজন বরণ্যে ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তি। যিনি তাঁর বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা, সততা ও দেশপ্রেম দিয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন। দেশে মব, হত্যা, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ হঠাৎ করেই বেড়ে যাচ্ছে, যা সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমাদের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আমি পার্টিকুলারলি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির প্রতি কোনো কথা বলতে চাই না এবং বলিও না।
সংক্ষেপে বলতে চাই, যে সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে, এই সুযোগকে যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তাহলে বাংলাদেশ আরো বহু বছর পিছিয়ে যাবে। প্রতিবার একটা করে অভ্যুত্থান হবে, জনগণ প্রাণ দেবে, আমাদের ছেলেরা প্রাণ দেবে। আর আমরা আমাদের দায়িত্বহীনতার কারণে সেই সুযোগ হারাব! এটা হতে দেওয়া উচিত নয়।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই একটি বিষয় একমত হই যে, আমাদের এই দেশকে আবার ফ্যাসিবাদের হাতে ছেড়ে দেব না। বিভিন্ন জায়গায় মতভেদ থাকতে পারে, সেগুলোর জন্য সুরাহা করতে আমরা জনগণের কাছে যাব। একটা কথা মনে করে দিচ্ছি, ১৯৭১ হচ্ছে আমাদের মূল কথা, স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের মূল কথা। এখানে আমাদের কোনো কমপ্রোমাইজ নেই। আমরা অবশ্যই গণতন্ত্র চাই। এর মূল বিষয় হচ্ছে, আলোচনা, সহনশীলতা, অন্যের মতকে মেনে নেওয়া। সব কিছু নিয়ে আমরা অবশ্যই এমন একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারব, যেখান থেকে আমরা আবার নতুন করে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারব।’
একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘এক বছরে গোটা রাজনীতির একটা গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের চিন্তা, মতাদর্শ ও রাজনীতির দিক থেকে একটা দক্ষিণপন্থী চিন্তার, ভাবাদর্শের উত্থান সংগঠিত হয়েছে। এই অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কোলে নিয়ে, বুকে নিয়ে ওই জায়গাটা তৈরি করছে। অনেকে গাছেরটাও খাচ্ছেন, আবার নিচেরটাও কুড়ানোর চেষ্টা করছেন।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘মিটফোর্ডে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং যেভাবে তার ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে ন্যারেটিভ হাজির করা হয়েছে, তা পরিষ্কার ষড়যন্ত্র। যেভাবে গোপালগঞ্জে হামলা হয়েছে, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখানোর জন্য ষড়যন্ত্র চলছে, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন—এই তিনটি জিনিসই আমাদের রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর অংশ) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুম, জেএসডির তানিয়া রব, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, গণফোরামের এম মিজানুর রহমান, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর, জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন, গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম বাবলু, মহাসচিব আবু ইউসুফ সেলিম প্রমুখ।