গত বুধবার হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত ও গতকাল শুক্রবার গোপালগঞ্জে করা তিনটি মামলায় দুই হাজার ৬০০-এর বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি নিউটন মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালসহ ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গোপালগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নৌপথেও টহল জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের অনেকে গোপালগঞ্জ শহর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। গোপালগঞ্জ শহরে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরেনি। কারফিউয়ের সময়সীমা আজ শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।এদিকে গত বুধবার গোপালগঞ্জে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ আরো এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে।নিহত ব্যক্তির নাম রমজান মুন্সি (৩৫)। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা পাঁচ হলো।উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গোপালগঞ্জে কারফিউয়ের সময় আরো বাড়ানো হয়েছে। গতকাল বিকেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মিডিয়া সেলে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।তাতে বলা হয়, গোপালগঞ্জে চলমান কারফিউ গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।জানা গেছে, গত বুধবার এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হামলা চালান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ সমমনা সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। ওই দিন রাত ৮টা থেকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল সকাল ১১টা পর্যন্ত কারফিউয়ের সময়সীমা বাড়ানো হয়। মধ্যে তিন ঘণ্টা বিরতি দিয়ে দুপুর ২টা থেকে আবার কারফিউ শুরু হয়।জন ও যান চলাচল বেড়েছিল : কারফিউ শিথিল থাকাকালে গতকাল গোপালগঞ্জ শহরে মানুষজন ঘরের বাইরে বের হয়। যান চলাচলও বেড়ে যায়। অবশ্য সকাল থেকে ওষুধের দোকান, রেস্টুরেন্ট খোলা ছিল। দুপুর ২টার পর কারফিউ শুরু হলে শহরে লোকজন কমে যায়। সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আগের দিনের চেয়ে গতকাল শহরের রাস্তাঘাটে লোকজন বেশি ছিল। সকাল ৮টায় পুলিশ লাইনস ও চুয়াডাঙ্গা মোড়ে গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট ও গোপালগঞ্জ-ব্যাসপুর রুটে বাস চলতে দেখা গেছে। শহরের কাঁচাবাজার, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। কারফিউ শিথিল থাকাকালে শহরের লঞ্চঘাট ও আশপাশে ইজি বাইক, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মাহিন্দ্রা ও মোটরসাইকেল চলাচল করেছে। কিছু দোকানপাট খুললেও মার্কেট বন্ধ ছিল। শহরের ফল ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, কারফিউয়ের জন্য শহরে ফলের দোকান বন্ধ থাকায় ফল নষ্ট হচ্ছে।তিন মামলায় আসামি ২৬০০ : গত বুধবার থেকেই শহরের বিভিন্ন স্থানে যৌথ বাহিনীর টহল ও অভিযান চলছে। জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় আসামিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের এক হাজার ৬৫৫ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে পুলিশ। গতকাল এসআই উত্তম কুমার সেন বাদী হয়ে কোটালীপাড়া থানায় ১৫৫ জনকে জ্ঞাত এবং এক হাজার ৫০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় দেখিয়ে মামলাটি করেন। গত বুধবার হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় গত রাত পর্যন্ত গোপালগঞ্জের তিনটি থানায় তিনটি মামলায় দুই হাজার ৬০০-এর বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেছেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপিনাথপুর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক আহম্মেদ আলী বিশ্বাস। পুলিশের ওপর হামলা, মারধর ও গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে এই মামলা করেছেন তিনি। এ মামলার নম্বর ১৫। মামলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি নিউটন মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালসহ ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে কমপক্ষে ৫০০ জনকে। অন্যদিকে সন্ত্রাস দমন আইনেই গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানায় অন্য মামলাটি করা হয়েছে। ওই মামলায় ৭০ জনের নাম উল্লেখ এবং ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। কাশিয়ানী থানার উপপরিদর্শক আলিমুল হক বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে এই মামলা করেন।গ্রেপ্তার ১৬৪ জন : দুই মামলায় গোপালগঞ্জ পুলিশ জেলার পাঁচটি থানায় অভিযান চালিয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে সদর থানায় ৪৫ জন, মুকসুদপুরে ৬৬ জন, কাশিয়ানীতে ২৪ জন, টুঙ্গিপাড়ায় ১৭ জন এবং কোটালীপাড়া থানায় রয়েছে ১২ জন। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।নৌপথে টহল জোরদার : দুষ্কৃতকারীদের ধরতে নদীপথে টহল জোরদার করেছে নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড। গতকাল দুপুরে নৌবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট সাজ্জাদ এবং কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হারুন-অর-রশীদ এই তথ্য জানান। তাঁরা জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে দুষ্কৃতকারীরা নদীপথ ব্যবহার করে যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সে লক্ষ্য সামনে রেখে গোপালগঞ্জ জেলার নদীপথে বিশেষ টহল পরিচালনা করছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী।আরো একজনের মৃত্যু : গত বুধবার গোপালগঞ্জে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ আরো এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম রমজান মুন্সি (৩৫)। তিনি ছিলেন রিকশাচালক। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ। নিহত রমজান মুন্সির বড় ভাই কামাল মুন্সি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না। সহজ-সরল মানুষ ছিল রমজান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় গ্রামেও ফিরতে পারছি না। ভয়ে এখনো ঢাকায় আছি।’জানা গেছে, বুধবারের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে একই হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিতে এসেছেন আরো দুই দিনমজুর। তাঁরা হলেন সুমন বিশ্বাস ও আব্বাস আলী সরকার।প্রসঙ্গত, জাতীয় নাগরিক পার্টি গত ১ জুলাই থেকে দেশে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি শুরু করে। গত মঙ্গলবার দলটি ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। এই কর্মসূচি ঘিরে ওই দিন রাত থেকেই গোপালগঞ্জে উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। পরদিন বুধবার সমাবেশের আয়োজন করা হয় গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্ক এলাকায়। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা পৌঁছার আগেই সমাবেশস্থলে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ সমমনা সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এই হামলা চালান। সমাবেশ শেষেও এনসিপির নেতারা হামলার মুখে পড়েন। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা পুলিশ সুপারের কার্যলয়ে নিরাপদে সরিয়ে নেয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। পরে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বিকেল ৫টার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় গোপালগঞ্জ ছেড়ে খুলনার দিকে রওনা দেন এনসিপির নেতারা।