সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

নিহতদের পরিচয় মিলেছে : শহর পরিষ্কারে কাজ করছে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা থমথমে গোপালগঞ্জ : বেড়েছে কারফিউ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

গোপালগঞ্জ সংবাদদাতা : গোপালগঞ্জের পরিস্থিতি এখন শান্ত, তবে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বাড়ানো হয়েছে কারফিউ। হামলার ঘটনায় নিহতদের পরিচয় মিলছে। সহিংসতার আরো তথ্য বেরিয়ে আসছে। জেলা কারাগারে হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে থানায় থানায়। শহরজুড়ে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল। গোপালগঞ্জের ধ্বংসযজ্ঞের স্থান পরিষ্কারে কাজ করছে সেনাবাহিনী ও সেচ্ছাসেবীরা। গোপালগঞ্জ এনসিপির সভামঞ্চসহ পুরো শহরজুড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন শহরজুড়ে সেনা ও বিজিবিও টহল অব্যাহত আছে।
গোপালগঞ্জ এনসিপির সভামঞ্চসহ পুরো শহরজুড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন দৃশ্যমান। সেনা ও বিজিবিও টহল অব্যাহত রেখেছে। গত বুধবার নাগরিক পার্টি এনসিপির পথসভা ছিল স্থানীয় চৌরঙ্গীর মোড়। এর বীপরীত পাশেই গোপালগঞ্জ খালপাড় জায়গা। স্থানীয় জনতার কাতারে ঘাপটি মেরে অস্ত্রসশস্ত্রে সজ্জিত ছিল শতাধিক সন্ত্রাসীর একটি দল। অপরদিকে, স্থানীয় হাসপাতাল মোড়, কোর্টপাড় চত্বর, স্টেডিয়াম চত্বর, ডিসি অফিস চত্বরসহ শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধ হয়ে অবস্থান নেয় বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পান দোকানদার ইনকিলাবকে বলেন।
দুপুর ১২টায় পদ্মাসেতু পার হয়ে মাদারীপুর টেকেরহাট পৌঁছানোর খবর গোপালগঞ্জে পৌঁছালে উক্ত স্থানগুলোতে জড়ো হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও সমর্থক এবং কতিপয় উগ্রবাদী হিন্দু যুবক, নারী একত্রিত হয়ে মুকসুদপুর ও কাশিয়ানির পথে তথা গোপালগঞ্জ শহরমুখী অংশে অবস্থান নেয় এবং এনসিপি নেতাদের পথে পথে বাধা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়। টেকেরহাট থেকে গোপালগঞ্জ প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ। এ পথের তিন দিক থেকে সন্ত্রাসীরা ছোট বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে নেতাদের রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে।
দুপুর দুইটার পর শহরের লিংক সড়কগুলোতে উগ্রবাদী যুবক-সন্ত্রাসীরা এক হয়ে শহরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে সংর্ঘষে লিপ্ত হয়। এসময় সন্ত্রাসীরা পুলিশের গাড়িতে হামলা করলে দুই পুলিশ আহত হয়। পুলিশ সরকারি হাতিয়ার ও জীবন রক্ষার স্বার্থে মানালে প্রবেশ করলে পুলিশের গাড়িটি জালিয়ে দেয়া হয়।
এ খবর শহরে ছড়িয়ে পড়লে শহরের কমপক্ষে ১০-২০টি পয়েন্ট লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা পুলিশ, এলিট ফোর্স ও সেনাবাহিনীর ওপর বিভিন্ন জায়গা থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বহু সদস্য কম-বেশি আহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ইটপাটকেল খেয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিলে সন্ত্রাসীরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
বুধবারের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জেরে গোপালগঞ্জে ২২ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয় যা আজও অব্যাহত আছে। গত বুধবার রাত ৮ হতে এ আদেশ জারি হয়। গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ ও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোপালগঞ্জে কারফিউ জারি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
বুধবার রাত ৮টা থেকে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ কারফিউ জারি থাকার কথা থাকলেও তা বেড়েছে আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। মাঝে ১১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত শিথিল থাকবে কারফিউ। এর আগে বিকেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোপালগঞ্জ সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
বুধবার বিকেলে গোপালগঞ্জে সভা শেষে ফেরার পথে এনসিপির গাড়িবহরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এসময় গোপালগঞ্জ শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এরপর এনসিপির শীর্ষ নেতারা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কে করে নিরাপদে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। এদিকে, হামলার ঘটনায় সারাদেশে বøকেড কর্মসূচি পালন করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
গত বুধবার নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনায় এনসিপি নেতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অপরগতা এবং দায়িত্বহীনতার অভিযোগ আনেন গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার এবং কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জের বিরুদ্ধে। নাহিদ ইসলাম বলেন, গোপালগঞ্জ সাবেক পতিত সরকার প্রধানের বাড়ি। আইন-শৃঙ্খলার পরিবেশ ঠিক থাকবে কিনা এরকম কোনো গোয়েন্দা তথ্য জেলার এসপি-ওসির কাছে মোটেই ছিল না বলে আমি মনে করি। তাদের যদি ইন্টেলিজেন্সী তথ্য না থাকে তা হলে এমন অযোগ্য এসপি ও ওসির দায়িত্ব পালন করাই বৃথা।
গোপালগঞ্জে রণক্ষেত্র কেন তৈরি হলো, কেন করলো, কারা করলো এমন সব তথ্য খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে দিনের আলোর মত ঘটনা। মূল রহস্য হলোÑ যেখানে পুলিশের প্রহরা বা টহল ছিল সেসব জায়গাতেই অস্ত্রসহ সন্ত্রাসীদের অবস্থান ছিল। এমন তথ্য উঠে আসছে। ইনকিলাবের সাথে কথা হয় গোপালগঞ্জ শহরের একজন আইনজীবীর সাথে। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বুধবার প্রথম হামলা হয় শহরের উলপুরে। এটা মূল শহরে ঢোকার প্রধান প্রবেশপথ। এলাকাবাসী জায়গাটিকে উলপুর মোড় হিসেবে বেশি চেনেন। এখনে প্রথমে পুলিশ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ-সন্ত্রাসীদের সাথে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া এবং ইট পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এখানে দু’জন পুলিশ সদস্য আহত হন। এরপর পুলিশ বিপথগামীদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। তাৎক্ষণিক লোকজনের জটলা একটু কমলে পরবর্তীতে তারা একজোট হয়ে পুনরায় পুলিশের ওপর চড়াও হয়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। দ্বিতীয়ত, শহরস্থ টংসুর মোড় এলাকায় বিচ্ছিন্ন বিপথগামীরা এক হয়ে সেখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর পুনরায় ইটপাটকেল মারতে থাকে সেখানেই দুইজন পুলিশ আহত হন।
দুটি স্থানে সন্ত্রাসীদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবর পেয়ে সদর নির্বাহী অফিসার আহত পুলিশদের দেখতে হাসপাতালে রওয়ানা হওয়ার পথে তার গাড়ি গতিরোধ করে দাঁড়ালে অস্ত্র, লাঠি-সোঁটা, রডসহ নানা ধরনের ধারালো অস্ত্র নিয়ে ইউএনওর গাড়ির ওপর হামলা করে তার গাড়িটি ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপরই বেপরোয়া সন্ত্রাসীরা আরে বিপরোয়া হয়ে পৌরসভার মধ্যে অবস্থিত জেলা কারাগারে হামলা করে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এমনকি কারাগারে মূল ফটক ও ভাঙার চেষ্টা করে।
সবচেয়ে রহস্যের বিষয় হলোÑ যতোগুলো অঘটন বা হামলা ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে তা সবই শহরের মধ্যে, তথা কোর্টচত্বর থেকে চৌরঙ্গী এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। এমন তিন-চারটি ঘটনার পয়েন্ট তো গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশের নাকের ঢগার ওপর। কিন্ত পুলিশের কাছে কোনো হামলা হওয়ার তথ্যই ছিলো না। এ দায় থেকে গোপালগঞ্জের এসপি ও ওসি দায় এড়াতে পারে না বলে ভুক্তভোগীর মত।
ইনকিলাবের সাথে কথা হয়, গোপালগঞ্জের বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মো. জাহাঙ্গীরের সাথে। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, যদিও আমরা গোপালগঞ্জের মানুষ, সঙ্গত কারণে আমরা একটু নির্যাতিত। তারপরও বিএনপি করি। কিন্ত আমরাও তো এনসিপি করি না। তারপরও তাদের ভালো-মন্দ কাজের ওপর আমাদের সমর্থন আছে। কিন্ত এনসিপির মঞ্চে উঠে তো আমরা বক্তব্য দিতে পারি না। সেরকম ঘটেছে। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, গোপালগঞ্জের দু’জন বিএনপি নেতা মঞ্চে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন।
গোপালগঞ্জে এখন কী হচ্ছে?
গত বুধবারের ঘটনার পর গোপালগঞ্জ শহর এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পুরো পৌরসভার জুড়ে চলছে সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল। পুলিশও টহল দিচ্ছেন। শহরের মোড়ে মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আছে কড়া নজরে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট আইন কর্তারা গত বুূধবার রাত ৮ থেকে ২২ ঘণ্টা প্রথম দফায় শহরে কারফিউ জারি করা হলেও তা বেড়ে আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা শিথিল থাকবে বলে জানা গেছে।
গোপালগঞ্জে কতজন হতা হত হলেন?
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বুধবারের হামলার ঘটনায়, হাসপাতালে চারটি লাশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেখতে পারেন। এ বিষয় হাসপাতালের পরিচালকের সাথে কথা হলে তিনি ইনকিলাবকে জানান, এরা কে কী কারণে মারা গেছেন তা জানি না, তবে তাদের দেহে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন, দীপ্ত সাহা (২৫) তার বাড়ী শহরের উদয়ন রোডে। রমজান কাজী (১৮)। তার বাড়ি টুঙ্গিপাড়া। মো. সোহেল রানা (৩০) এবং মো. ইমন। এদের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরেই।
হামলার ঘটনায় আটক হলো কতজন?
হামলার ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। তবে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে সব তথ্য জানানো হবে বলে পুলিশ সুপারের অফিস সূত্রে জানা গেছে। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে এবং কোতোয়ালি থানার সূত্রে জানা গেছে, এনসিপির নেতাদের ওপর হামলা এবং শহরের উন্মুক্ত সন্ত্রাসী কর্মকাÐে জড়ানো এবং পুলিশ সদস্যদের আহত করা, ইউএনও ও পুলিশের গাড়িতে হামলাম, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মোট ১৪ জন আটকের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গোপালগঞ্জের সর্বশেষ পরিস্থিতি :
শহরের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের উচ্ছৃংখল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বেপরোয়া হামলায়, কারাগার রোড, চৌরঙ্গী সড়ক, টংসুর, কোর্ট চত্বর, পৌরসভা চত্বর, এলাকার সবক’টি সড়কে পড়ে ছিল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। সড়কগুলো সব ইটপাটকেলসহ বিভিন্ন লাঠিসোঁটায় পরিপূর্ণ। সড়কগুলো জনচলাচলের উপযোগী করতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এলাকাবাসী ও সেচ্ছাসেবীদের নিয়ে পরিষ্কার করছেন। সকাল থেকে শুরু হওয়া পরিচ্ছন্ন কাজ এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চলমান আছে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com