পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) নিয়ে আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশকে যুক্ত করার প্রসঙ্গ ওঠেনি বলে । জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ শুরু থেকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতেও তৃতীয় কোনো দেশের উল্লেখ নেই।
শুক্রবার ( ৩০ অক্টোবর) ভোরে প্রধানমন্ত্রী চার দিনের জাপান সফর শেষে দেশে ফেরেন। দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে বৃহত্তর শিল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কিনা– জানতে চান এক সাংবাদিক।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে বসে এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। জাপানের সঙ্গে এবারের আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশকে যুক্ত করার প্রসঙ্গ আসেনি।
বিগ-বি নিয়ে যৌথ বিবৃতির অবস্থান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে উদ্যোগটিকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের বাইরে অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সমুদ্রপথ নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। এ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের উপস্থিতি প্রয়োজন।
বিগ-বি ও মাতারবাড়ী নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। দলটির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও বক্তব্য প্রত্যাশা করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, যৌথ বিবৃতি পড়লেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। না দেখে, না বুঝে বা না পড়ে দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করা ঠিক নয়।
জাপানের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এবং ঋণের সুদের হার নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো ঋণ, অনুদান ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে বাংলাদেশ ঋণ, সহজ শর্তের ঋণ ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
জাপানের ঋণের সুদের হার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি উল্লেখ করে এক সাংবাদিক জানতে চান, বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি সুদে জাপানের ঋণ নেওয়া হবে কিনা? জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির বড় অংশই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ। কোন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, তা আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিকল্পগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে– এমন বিনিয়োগই গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। বিনিয়োগ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বাইরে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনে (জেট্রো) দুই দেশের বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
২৬ অক্টোবর সরকারি সফরে জাপানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের দুটি ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এসব চুক্তির মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার অনুদান সহায়তার চুক্তিও রয়েছে।