কানাডীয় লেখক অ্যান কারসন এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও অধ্যাপক। কারসনের বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’, ‘গ্লাস, আইরনি অ্যান্ড গড’, ‘নক্স’, ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ ইত্যাদি। ৮ অক্টোবর পুরস্কার ঘোষণার দিন নোবেল কার্যালয়ের প্রতিনিধিকে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকার নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর নকিব মুকশি
জেনি রাইডেন: হ্যালো, আমি জেনি রাইডেন, নোবেল কার্যালয় থেকে বলছি। কেমন লাগছে এত বড় পুরস্কার পেয়ে? খবরটা যখন পেলেন, কী করছিলেন, কী ভাবছিলেন?
অ্যান কারসন: নাস্তা করছিলাম। না, নাটকীয় কিছু ঘটেনি। তখন তো কেবল সকাল হলো। এক কাপ চা নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে বসলাম, হাতে লন্ডন রিভিউ অব বুকস ম্যাগাজিন। পড়ছিলাম, আর চায়ে চুমুক। হঠাৎ খেয়াল করলাম, মেঝেটা ঝাঁট দেওয়া দরকার। এরই মাঝে একের পর এক ফোনকল। আমি কেটে দিচ্ছিলাম। যখনই এভাবে ফোন বাজতে থাকে আমি কেটে দিই।
রবার্ট কারি: আমি ওর জীবনসঙ্গী বলছি। আপনার কিন্তু আমাকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত! কারণ, আমিই বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে এই নম্বরে কলব্যাক করিয়েছি।
ll হ্যাঁ, ফোন এলে ও-ই ধরে। আমার অভ্যাস হলো ফোন বাজলেই কেটে দেওয়া। ও ফোন ধরে, আর আমাকে কলব্যাক করতে বলে। ব্যাপারটা কেমন পাগলামি, না? আর মনে হচ্ছে আপনারা বুঝি সবাই পাগল হয়ে গেছেন।
l বলছিলেন, সে সময় বাড়িতে ছিলেন।
ll রিকজাভিকে, সমুদ্রের কোলঘেঁষে। জানালা দিয়ে আর্কটিক সাগর দেখা যায়। সরি, আপনাকে তেমন স্মরণীয় কিছু বলতে পারছি না। দিনটা আর দশটা দিনের মতোই কেটেছে আমাদের।
l এই যে প্রাপ্তি, নোবেলের অর্থ নিয়ে আপনার কোনো ভাবনা বা পরিকল্পনা কি মনে এসেছে?
ll তেমন কিছু না। আমরা আপাতত ভাবছি পুরস্কারের টাকাটা দিয়ে কাউকে সহায়তা করা যায় কি না। আমাদের এক বন্ধু আছেন তার একটা বাড়ি দরকার। তা ছাড়া আমরা তো মাঝেমধ্যে ডক্টরস ইউদাউট বর্ডারসে দান করে থাকি। তো এ ধরনের কোথাও টাকাটা দিয়ে দেব কিংবা কাউকে সহায়তা করব, এমন ভাবছি।
l আর এই প্রাপ্তি কিভাবে উদযাপন করবেন তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা?
ll বাইরে যাব, বনের পথ ধরে হাঁটতে থাকব, যেন কারো ফোন না ধরতে হয়। এরপর নির্জনতা উপভোগ করব, নৈঃশব্দ্যের শব্দ শুনতে থাকব।
l বাহ! আপনার সাহিত্যকর্ম প্রসঙ্গে জানতে চাইছি। নতুন পাঠকের নিজের লেখকসত্তাকে এক কথায় কীভাবে তুলে ধরবেন?
ll আমার লেখক হয়ে ওঠা ‘অনিচ্ছাকৃত’। সবসময়ই যা-ই করতে চেয়েছি, শেষমেশ তা লেখালেখিতে এসে ঠেকেছে।
l নতুন পাঠকেরা আপনার কোন বই দিয়ে শুরু করতে পারে?
ll জানি না, হয়ত যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করা যায়। অধিকাংশ মানুষ তো ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ বইটি দিয়ে শুরু করে। পাঠক হিসেবে পড়েছি এটা, বেশ সহজবোধ্য। তবে আমি সব সময় বলি, মাঝখান থেকে শুরু করুন।
l যখন নতুন কোনো বই লিখতে শুরু করেন, শুরু কিভাবে হয়? আপনার লেখালিখির প্রক্রিয়া জানতে চাই।
ll মাঝখান থেকে শুরু করি—এটাই আমার জীবনদর্শন, অদ্বিতীয় নিয়ম। এর অর্থ আপনি যা-ই করুন না কেন, মাঝখানটা খুঁজে বের করুন, আর সেখান থেকেই শুরু করুন।
l আপনার কি অনুপ্রেরণার এমন কোনো নির্দিষ্ট উৎস আছে, যেখানে বারবার ফিরে যান?
ll হোমারের কাছে বারবার ফিরে যাই।
l আপনি প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিল্পসাহিত্য-ভাষা-দর্শন-ইতিহাস প্রভৃতি ধ্রুপদী বিষয়ে শিক্ষকতা করেন, এবং দেখা যায় এমন ধ্রুপদী বিষয়গুলোই লেখায় উঠে আসছে আধুনিক প্রেক্ষাপটে। মানুষের কাছে এসবের চিরপ্রাসঙ্গিকতাকে কিভাবে দেখেন?
ll বিশেষ প্রাসঙ্গিক এসব- আমি তা মনে করি না। সত্যি বলতে, এই সময়ে এগুলো প্রাসঙ্গিক কি না এ নিয়ে আমি ভাবি না, আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহ— ধ্রুপদী ভুবনের কাছে আমাদের প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠায়। অর্থাৎ আমরা তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছি কিনা, এখানেই আমার ভাবনা।
l আপনি একবার বলেছিলেন, একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার। কেন এমন ভেবেছিলেন?
ll কেউ তো একঘেয়েমি পছন্দ করে না। আপনিও নিশ্চয়ই এড়িয়ে চলেন।
l ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলছিলেন…
ll না, গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় আসলে। দিনের কোন কাজটা আগে করব, ঝাঁট দেবো না হোমার পড়ব, তা ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ। জীবন বড় একঘেয়ে, বিরক্তিকর।
l আসলেই এমনটা মনে করেন?
ll আমি ভুল, প্রমাণ করুন।
l ভালো ছিল! বেশ, যাঁরা লেখক হতে চান, তাঁদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?
ll তেমন কিছু বলার নেই। মাঝখান থেকে শুরু করুন- এটুকুই।