গত ১৫ সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের দেড়শ বছর পূর্ণ হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শ্রদ্ধা জানিয়ে তরুণদের তাঁর লেখা পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকায় ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় ‘সার্ধশত জন্মবর্ষ’ শিরোনামে আলোচনা হয়েছে। কলকাতায় সৃজিত মুখোপাধ্যায় ‘পথের দাবী’ নিয়ে বানাচ্ছেন ‘এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’। আয়োজনের অভাব নেই, তবু প্রশ্নটা থেকে যায়: আমরা কি সত্যিই শরৎকে পড়ি? অনেকের কাছে তিনি শুধু ‘দেবদাস’-এর লেখক, চোখের জলের কারিগর।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, হুগলির দেবানন্দপুরে। বাবা মতিলাল ছিলেন ভবঘুরে স্বভাবের মানুষ। গল্প-উপন্যাস শুরু করতেন, শেষ করতেন না। ফলে সংসার চলত না। সেই শৈশব পরে বারবার ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়।
১৮৯৪ সালে এন্ট্রান্স পাস করলেও দারিদ্র্যের কারণে এফএ শেষ করতে পারেননি। ভাগলপুরের বন্ধু রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার ওরফে রাজুর আদলেই গড়ে ওঠে ‘শ্রীকান্ত’-এর ইন্দ্রনাথ। এর সবচেয়ে আপডেট তথ্য দিয়েছেন আকিমুন রহমান। বলেছেন, ‘এমন অভিনব দুরন্ত কিশোর বাংলা সাহিত্য এর আগে পায়নি।’ তুলনা করেছেন মার্ক টোয়েনের টম সয়ার ও হাকলেবেরি ফিনের সঙ্গে। তলস্তয়ের প্রভাবের কথা তিনি বলেছেন। ১৮৯৫ সালে মাকে হারান। ১৯০৩ সালে ভাগ্যের খোঁজে পাড়ি দেন রেঙ্গুনে। সেখানে সরকারি অফিসে কেরানির চাকরি করে ফেরেন ১৯১৬ সালে। পরে বাস করেছেন শিবপুরে, তারপর রূপনারায়ণের তীরে নিজের বাড়িতে।
প্রথম গল্প ‘মন্দির’ ছাপা হয় মামা সুরেন্দ্রনাথের নামে। নিজের নামে বড় সাফল্য আসে ১৯০৭ সালে, ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘বড়দিদি’ দিয়ে, প্রায় রাতারাতি। এরপর একে একে বিন্দুর ছেলে, পরিণীতা, বৈকুণ্ঠের উইল, পল্লীসমাজ, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দত্তা, দেনা-পাওনা।
‘দেবদাস’ লেখা হয় ১৯০১ সালে, ছাপা হয় ১৯১৭ সালে। ধনী ঘরের ছেলে দেবদাস ছোটবেলার প্রতিবেশী পার্বতী ওরফে পারুকে ভালোবাসে। পরিবার মর্যাদার দোহাই দিয়ে আপত্তি করলে সে রুখে দাঁড়াতে পারে না। তারপর মদ আর চন্দ্রমুখীর আশ্রয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়।
এই গল্পের আসল জোর হলো নায়ককে মহান না বানানো। দেবদাস দুর্বল, সিদ্ধান্তহীন, নিজের সর্বনাশের জন্য নিজেই দায়ী। পার্বতী মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যায়। চন্দ্রমুখী সমাজের চোখে পতিতা হয়েও ভালোবাসায় সবার ওপরে ওঠে। ১৯২৮ সালের নির্বাক ছবি থেকে প্রমথেশ বড়ুয়া, সায়গল, বিমল রায়, সঞ্জয় লীলা বনসালি, এমনকি ২০০৯ সালের অনুরাগ কাশ্যপের ‘দেব ডি’ পর্যন্ত– একশ বছর ধরে গল্পটা ফিরে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশে বুলবুল আহমেদ। ‘শ্রীকান্ত’ বেরোয় চার খণ্ডে (১৯১৭, ১৯১৮, ১৯২৭, ১৯৩৩), আত্মজৈবনিক ধাঁচে, লেখকের ছদ্মনাম ‘শ্রীকান্ত শর্মা’র আড়ালে। শ্মশানে রাত কাটানো, বার্মার জীবন, ভবঘুরের পথচলা– সবই আছে এতে। অন্নদা দিদি আর অভয়া সমাজের বাইরে দাঁড়িয়েও নিজের মর্যাদা ধরে রাখেন। রাজলক্ষ্মী ওরফে পিয়ারী বাইজি ভালোবাসার জন্য সব মেনে নেন, আবার আত্মসম্মানও ছাড়েন না। শ্রীকান্ত নিজে আদর্শ নায়ক নন, তিনি দর্শক আর সাক্ষী, আর তাঁর চোখ দিয়েই পাঠক সমাজের নানা মুখ দেখে।
‘পল্লীসমাজ’-এ গ্রামবাংলার দলাদলি আর ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের ছবি। ‘চরিত্রহীন’ নামটাই সে যুগে বিতর্কের কারণ ছিল, কারণ এখানে সতীত্ব ও চরিত্রের চলতি সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করা হয়েছে। ‘গৃহদাহ’-তে ধর্ম, সংস্কার আর ব্যক্তির ইচ্ছার দ্বন্দ্ব। ১৯৩১ সালের ‘শেষ প্রশ্ন’-এ কমল বিয়ে, ঐতিহ্য আর নীতি নিয়ে এমন সব প্রশ্ন তোলে, যা আজও অস্বস্তি জাগায়।
‘পথের দাবী’ প্রথমে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ছাপা হয়। বই হয়ে বেরোয় ১৯২৬ সালের ৩১ আগস্ট। ২০২৬-এ এসে ‘পথের দাবী’র শতবর্ষ পার হলো। পাঁচ হাজার কপি ফুরিয়ে যায় সাত দিনে, আর তিন টাকার বই বিক্রি হয় ১০ টাকায়। ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১২৪ ধারায় বইটি নিষিদ্ধ করে। অনেকে বইটি হাতে লিখে নকল করে নিয়েছিলেন। এ লেখা কল্পনার খেয়াল ছিল না। শরৎ দীর্ঘদিন হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন, নিয়মিত খদ্দর পরতেন, কাছে একটি রিভলভারও রাখতেন। রাজনীতিতে ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থক। কেন্দ্রীয় চরিত্র বিপ্লবী সব্যসাচীর মডেল হিসেবে কেউ কেউ যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের নাম করেন।
তবু বইটা শুধু বন্দুকের গল্প নয়। প্রাণ আছে সব্যসাচী আর অহিংসপন্থি ভারতীর তর্কে। ভারতী জানতে চায়, রক্তপাতের জবাব রক্তপাত হলে সভ্যতা কি এর চেয়ে বড় উত্তর কোনো দিন দিতে পারবে না? সব্যসাচী বিপ্লবের বাইরে জীবনকে ছোট করে দেখে না। সে বলে, ‘স্বাধীনতাই স্বাধীনতার শেষ কথা নয়।’ অপূর্ব যখন দেশের কাজে আত্মনিয়োগের কথা বলে, সব্যসাচী উত্তর দেয়, ‘সাধু প্রস্তাব।’ ১৯২৯ সালের এক ভাষণে শরৎ নিজেও বলেছিলেন, অর্থহীন বিপ্লবের চেষ্টায় কেবল রক্তপাত ঘটে। পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে তিনি এঁকেছেন কারখানার শ্রমিকদের নরকতুল্য জীবন।
“শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’: বিশ্লেষণের আলোকে” ধ্রুবকুমার মুখোপাধ্যায় বলছেন (২০১৯), ‘রাজনৈতিক বা সামাজিক, যে পটভূমিতেই লিখুন, দেশ ও দেশবাসীর মঙ্গলচিন্তা থেকে শরৎ নিজেকে কখনও বিচ্ছিন্ন করেননি। বিদেশি শাসক-শোষক আর স্বদেশের ক্ষমতাবান স্বার্থপর অত্যাচারী, দুইয়ের বিরুদ্ধেই কলম চালাতে তিনি আগ্রহী ছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ভাবতেন কর্তব্য।’ শরতের শৈশবের অভাব মনে করিয়ে দেয় চার্লস ডিকেন্সকে। বাবা ঋণের দায়ে জেলে গেলে ১২ বছরের ডিকেন্সকে কারখানায় কাজ নিতে হয়েছিল। সেই ক্ষত বয়ে গেছে ‘অলিভার টুইস্ট’ ও ‘ডেভিড কপারফিল্ড’-এ। দুজনের লেখাতেই দারিদ্র্য, শিশুর অসহায়তা আর সমাজের উদাসীনতা কেন্দ্রে। দুজনেই জনপ্রিয় ছিলেন, আর সেই জনপ্রিয়তাকে করেছেন সমাজ সমালোচনার হাতিয়ার। নারীর মর্যাদার প্রশ্নে পাশে রাখা যায় টমাস হার্ডির ‘টেস’-কেও, যেখানে সমাজের চোখে ‘পতিতা’ নারীই পাঠকের সহানুভূতি টানে। ‘পথের দাবী’র পাশে আরও কৌতূহল জাগানো তুলনা জর্জ অরওয়েল। বাংলার মতিহারিতে ১৯০৩ সালে জন্মানো অরওয়েল ১৯২২ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত বার্মায় ইন্ডিয়ান ইম্পেরিয়াল পুলিশে কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা ‘বার্মিজ ডেজ’, ‘আ হ্যাঙিং’, ‘শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট’। ‘বার্মিজ ডেজ’ ১৯৩৪ সালে প্রথম ছাপা হয় যুক্তরাষ্ট্রে, কারণ ব্রিটিশ প্রকাশক মানহানির ভয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। শরৎ বার্মা ছেড়েছিলেন ১৯১৬ সালে, অরওয়েল যান ছয় বছর পরে। দুজনের সময় মেলেনি, কিন্তু দেখার জায়গা ছিল দুই প্রান্তের: শরৎ দেখেছেন শাসিতের জায়গা থেকে, অরওয়েল শাসকের ভেতর থেকে। দুজনেই সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, দুজনের বইই বাধার মুখে পড়েছে। তফাত একটাই। ডিকেন্স ও অরওয়েল ইংরেজির বিশাল পাঠকের কাছে পৌঁছেছেন, শরৎ সেই সুযোগ পাননি। তাই বিশ্বসাহিত্যে তাঁর আসন নিয়ে আলোচনা কম।
‘মহেশ’ বাংলা ছোটগল্পের অসামান্য কাহিনি। দরিদ্র কৃষক গফুর, মেয়ে আমিনা আর তাদের বলদ মহেশ। চট্টগ্রামের গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় ‘গফুর-আমিনা সংবাদ’ (১৯৭৬) নামে উল্লেখযোগ্য নাটক মঞ্চস্থ করেছে। জমিদার আর পণ্ডিত তর্করত্ন শাস্ত্রের ব্যাখ্যায় গফুরকে দোষী করেন, অথচ নিজেরা গরুকে খড় দিতে নারাজ। শেষে মেজাজ হারিয়ে গফুর নিজের হাতেই মহেশকে মেরে ফেলে, তারপর গ্রাম ছেড়ে চটকলে কাজ নিতে যায়। যাওয়ার সময় আল্লাহর কাছে নালিশ জানায়, যারা মহেশের ঘাস-পানি কেড়েছে, তাদের যেন ক্ষমা করা না হয়।
‘অভাগীর স্বর্গ’-এ নিচু জাতের গরিব অভাগী উঁচু জাতের গৃহিণীর ধুমধাম করে সৎকার দেখে নিজের মৃত্যুর কথা ভাবে। মৃত্যুতেও যে বৈষম্য ঘোচে না, গল্পটা তা নির্মমভাবে দেখায়।
প্রবন্ধেও তিনি স্পষ্ট। ১৯২৩ সালের ‘নারীর মূল্য’-তে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে উপন্যাসের প্রশ্নগুলো সরাসরি যুক্তির রূপ পেয়েছে। ‘সাহিত্যের আর্ট ও দুর্নীতি’-তে তিনি লিখেছেন, বাংলা সাহিত্য যেদিন রুশ সাহিত্যের মতো সমাজের নিচের স্তরে নেমে মানুষের সুখ-দুঃখের মাঝখানে দাঁড়াবে, সেদিন সে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাবে। তাঁর নিজের লেখা এই ডাকেই সাড়া দিয়েছে।
১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দেয়, ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেয় ডি.লিট। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার পার্ক নার্সিং হোমে ৬১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
শরৎকে চিনতে হলে ‘দেবদাস’-এর বাইরে তাকাতে হবে। দেবদাসে ভাঙা হৃদয়, ‘পথের দাবী’-তে ভাঙতে চাওয়ার সাহস, ‘মহেশ’-এ নিঃশব্দ ক্ষোভ, ‘শেষ প্রশ্ন’-এ অস্বস্তিকর জিজ্ঞাসা। তাঁর প্রশ্নগুলো এখনও পুরোনো হয়নি। জাত, ধর্ম আর দারিদ্র্যের নামে মানুষ এখনও মানুষকে ছোট করে। নারীর ভালোবাসা ও স্বাধীনতা সমাজ এখনও সহজে মেনে নেয় না। ক্ষমতার বিরুদ্ধে লেখকের দায় নিয়ে প্রশ্নও আজ আরও তীব্র।