সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশের সংকট মোকাবিলায় সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন। ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা চাওয়া হলে দেশ দুটি ইতিবাচক সাড়া দেয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে এমন তথ্য জানিয়েছেন।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনের এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনায় দেশটির সমর্থন ও সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

তারা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্য আমদানির বড় প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মার্কিন অনুদান ও বিশেষ সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এ দাবিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে বলে বৈঠক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এগিয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে আমরা আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা একমত যে, বাংলাদেশ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবও অর্থনীতিতে পড়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো  মনে করছে। এ কারণে বাংলাদেশকে সহযোগিতার বিষয়ে তারা আশ্বাস দিচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এসব সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা ও দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগে জোর
বার্ষিক সভার বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথাগত সার্বভৌম ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও খোঁজা হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অর্থনীতির পুনর্গঠনে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। এ জন্য করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জানানো হয়েছে, ব্যাংক খাতের সংস্কারেও সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি কোনো কিছু লুকিয়ে না রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে মোকাবিলা করছে বর্তমান সরকার। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সরকারের সংস্কার কৌশলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে।

সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর
মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ থেকে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকেও সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশীদারদের জানানো হয়েছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জোর আইএমএফের 
দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক তরুণের এই জনমিতিক সুবিধা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চাপে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।

গতকাল বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এমন অবস্থান তুলে ধরে। আইএমএফের বৈশ্বিক নীতিগত কর্মসূচি নিয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।

আইএমএফ জানায়, উন্নত অর্থনীতি ও কয়েকটি উদীয়মান দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ হওয়ায় এসব অঞ্চলের সামনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথাযথ বিনিয়োগ।

আইএমএফ বলেছে, তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশগুলোকে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু নির্দিষ্ট কিছু চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে কর্মীদের নতুন কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের দ্রুত বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে পরিবর্তন আনতে পারে এবং আয়বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।

আইএমএফ বলেছে, প্রযুক্তির সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি এমন নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল সমাজের বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজে লাগে। অর্থাৎ, শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই হবে না; এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া সুযোগ যেন নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য তাই বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী নয়, বরং তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।

ঢালাও ভর্তুকি কমানোর তাগিদ
বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ঋণের চাপ সামাল দিতে কর ব্যবস্থার সংস্কার, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো এবং ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা বাড়ানো, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সহায়তা দিতে হবে। তবে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ এড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত ‘ফিসক্যাল মনিটর’বিষয়ক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় উঠে আসে। এতে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস এবং বিভাগের ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি। ব্রিফিংয়ে যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে থিলেন পাভিস দেবাহাসাদিন।

আইএমএফের মতে, ঢালাও ভর্তুকি সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে এর সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এ কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে সবাইকে সমানভাবে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে নিম্ন আয়ের মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা কার্যকর করা উচিত।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com