আজ ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠবে ২০তম এশিয়ান গেমসের। এদিকে কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের বেশ কয়েক দিন আগেই বিভিন্ন খেলা শুরু হয়ে গেছে।
জাপানে ২০তম এশিয়ান গেমস হলো এশিয়ান চেতনার অপূর্ব প্রদর্শনী। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জৌলুস আর আগ্রহের দিক থেকে অলিম্পিকের পরেই এশিয়ান গেমসের স্থান। এই চত্বর চার বছর পর পর তুলে ধরে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এশিয়া কিভাবে এগিয়ে চলেছে। এশিয়ার কোন কোন দেশ মানবসম্পদকে ক্রীড়াঙ্গনে যথাযথভাবে কাজে লাগাচ্ছে।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ‘ব্রেইন চাইল্ড’ হলো এশিয়ান গেমস। তাঁর বিশেষ উৎসাহ এবং আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে এই গেমসের উৎপত্তি ১৯৫১ সালে ভারতের দিল্লিতে। এবার ৭৫ বছরে এসেছে ২০তম গেমস। এশিয়ার সর্ববৃহৎ মুগ্ধ করা ক্রীড়া উৎসব। এশিয়ান গেমসের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো, মহাদেশের বাইরে সারা দুনিয়া এই গেমসের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এশিয়ার চীন তো অলিম্পিকের মেডেল তালিকায় এক থেকে তিনের মধ্যে আছে বিগত কয়েকটি অলিম্পিকে। তা ছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন খেলায় উত্তাল বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এগিয়ে চলার চমৎকার উদাহরণ। এশিয়া মহাদেশ ক্রমেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের মানচিত্রকে বড় করে চলেছে। সব সময় এশিয়ার দেশগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো।
বাংলাদেশ থেকে বড় একটি ক্রীড়া কন্টিনজেন্ট এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছে ২২ খেলায়। খেলোয়াড়, ক্রীড়াবিদ কর্মকর্তা আর অন্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা ও লেখালেখি হয়েছে। এখন আবার সবকিছু স্তিমিত হয়ে গেছে। উড়োজাহাজের সিটে বসে হাসিমুখে অনেকেই ছবি তুলেছেন। এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি পুরোপুরি অরণ্যে রোদন, লিখলে একদল বেজার হয়, একদল খুশি হয় এবং আরেক দল আছে, যারা জনগণের করের টাকায় লক্ষ্যহীন অংশগ্রহণকে বিভিন্নভাবে জায়েজ করার জন্য ব্যস্ত।
১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছে। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, এতগুলো বছর পার হওয়ার পরও প্রতিবার লক্ষ্য ছাড়া, পর্যাপ্ত অনুশীলন ছাড়া বিরাট ক্রীড়াবহর বারবার অংশ নিচ্ছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক এবার প্রকাশ্যে জোরালো ভাষায় এই লক্ষ্যহীন অংশগ্রহণের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁর কথা হলো, এভাবে চলতে পারে না। অংশগ্রহণের জন্য অংশগ্রহণের দিন শেষ। পদক জয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত পদক জয়। আগামী গেমস থেকে আর ঢালাওভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খেলাগুলো নির্বাচন করে লম্বা সময় ধরে পর্যাপ্ত অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুতির পর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। ক্রীড়াঙ্গনে আর বাজে সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে না। অযথা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে যাওয়ার দরজা বন্ধ হবে। কোচের পদবি ব্যবহার করে আর ভবিষ্যতে কর্মকর্তারা বিদেশভ্রমণ করতে পারবেন না।
অতিমূল্যায়ন কিছু সংগঠককে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলেছে। অথচ কয়েক বছর আগে এসব সংগঠকের তেমন পরিচিতি ছিল না।
দেশের ক্রীড়াঙ্গন ইতিবাচক সময় পার করছে না, বরং পার করছে ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় সময়। ক্রীড়া প্রশাসনের বিভিন্ন খেলায় প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে তোলার খেলা চলছে। ভঙ্গুর অবস্থা। ক্রীড়াঙ্গনে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ। এই অবস্থাটা কেন হলো? ক্রীড়াঙ্গনে জনগণের অংশগ্রহণ এবং জনগণের অংশীদারির পার্থক্য অনুধাবন করা দরকার।
ক্রীড়াঙ্গনের পশ্চাদযাত্রা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন চিন্তাশীল পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তি এবং সাংগঠনিক দক্ষতা ছাড়া উপায় নেই। বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়াঙ্গনে নবজাগরণের কাব্য শোনানো হয়েছে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন। ক্রীড়াঙ্গনে সংগঠকদের মধ্যে কোনো ধরনের আত্মোপলব্ধি নেই।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ক্রীড়াঙ্গনের সংকট অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে নির্বাচিত সরকার পার পেতে চাইছে না। আশু সমস্যার সমাধানের জন্য পরিকল্পনা নির্ণয় করে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এখন যেভাবে ক্রীড়াঙ্গন চলছে, এটি তো চেনা নয়—সরকার এবং সচেতন মহল সবাই বুঝতে পারছে। বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম এবং অগণতান্ত্রিক চর্চা ক্রীড়াঙ্গনের মেরুদণ্ডকে শক্ত হতে দেয়নি। এখন ধৈর্য ধরতে হবে। সময় লাগবে। ক্রীড়াঙ্গন তখনই ভালোভাবে চলবে, যখন সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষ কাজ করবেন। ক্রীড়াঙ্গনে কাঠামোগত সংস্কার খুব জরুরি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি ক্রীড়াঙ্গনে অরাজকতা, লক্ষ্যহীনতাকে স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেব, নাকি এটিকে পরিবর্তনের চেষ্টা করব? গণতান্ত্রিক সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তন আনতে চাইছে। কাজও শুরু করেছে। এই কাজগুলোর পরিধি অনেক বড়। এর জন্য প্রয়োজন তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি খেলার ক্ষেত্রে সংগঠকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং আন্তরিক চেষ্টা।
ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে ইতিহাস নির্মাণের জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে কাজ করা। স্থূল চেষ্টাগুলো শুধু লোক-দেখানো হবে, কাজে আসবে না। ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতি কঠিন ব্যাধি নিয়ে চলছে কয়েক যুগ ধরে। এই রোগটি সারছে না। প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলে পূর্বসূরিকে দোষারোপ করা হয়েছে। এতে সমস্যার সমাধান তো হয়নি, বরং ক্রীড়াঙ্গনে রেষারেষি এবং বিভাজন বেড়েছে। বর্তমান সরকারের ইতিবাচক দিকটি হলো, ‘পূর্বসূরি সব শেষ করে দিয়েছে’—এই ব্লেম গেমে না জড়িয়ে পড়ে চেষ্টা করছে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে পরিবর্তন সাধন। লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্রীড়াঙ্গনকে অর্থবহ করা। খেলা এখন আর নিছক খেলা নয়, খেলার গুরুত্ব জাতির জীবনে অপরিসীম। খেলাকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তন সম্ভব। সব সময় বলি এবং বিশ্বাস করি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। তাহলে কেন বাংলাদেশের জয় ক্রীড়াঙ্গনে দেখতে পারব না।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া