সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৩ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতালের পাঁচটি সিঁড়ির ৪টিতেই কেন তালা ছিল, দায় কার?

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে

‌‘আমার দুই ভাতিজা হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ভাবির সিজারিয়ান অপারেশন হওয়ায় তার সঙ্গে আমার মাও ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় আমিসহ পরিবারের ছয় জন হাসপাতালে ছিলাম। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়ায় রোগী ও স্বজনরা ওয়ার্ড থেকে হুড়োহুড়ি করে বের হতে থাকেন। কিন্তু ভবনের পাঁচটা সিঁড়ির মধ্যে চারটিতেই তালা ছিল। বাকি একটি সিঁড়ি দিয়ে সব রোগী ও স্বজনরা নামতে গিয়ে পড়ে আহত হন।’

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকালে কথাগুলো বলেছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের লিফটে আগুন লাগার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্বজন বাবুল মিয়া। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেকে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হন এবং চার জনের মৃত্যু হয়।

গতকালের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাবুল মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি মাত্র সিঁড়ি খোলা থাকায় সেখানে রোগী ও স্বজনদের বিশাল ভিড় দেখা দেয়। বের হতে না পেরে উত্তরের গেটের সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করি আমরা। কিন্তু সেটি তালাবদ্ধ ছিল। আমার দুই ভাতিজাকে কোনোমতে সিঁড়ির এক ফাঁক দিয়ে কষ্ট করে বের করে দিয়েছি। ছোট ভাইকেও বের করতে পেরেছি। কিন্তু আমার মা, ভাবি এবং আমি বের হতে পারি নাই। অনেকক্ষণ পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে তালা কেটে আমাদের বাইরে বের করেন।’

তিনি বলেন, ‘একটা মাত্র সিঁড়ি খোলা থাকায় সব রোগী ও সঙ্গে থাকা স্বজনরা সেখানে ভিড় জমান। অনেকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়েছেন। তবে কেউ মারা গেছে, এরকম দেখি নাই।’

হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মাঝে এখনও আতঙ্ক কাটেনিহাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মাঝে এখনও আতঙ্ক কাটেনি

আরেক রোগীর স্বজন কামাল হোসেন বলেন, ‘এত বড় হাসপাতাল কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নেন। অথচ একটিমাত্র সিঁড়ির খোলা রেখে বাকিগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সবগুলো সিঁড়ি যদি খোলা থাকতো তাহলে রোগী ও স্বজনদের বাইরে বের হতে তেমন কষ্ট হতো না। আমরা চাই এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে। যাদের গাফিলতি ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিতে তালা লাগানো ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনরা নিচে নামতে গিয়ে এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করায় পড়ে গিয়ে আহত হন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আটতলা নতুন ভবনটিতে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি আছে। লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদফতরের। পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। বাকি চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালা দেওয়া থাকতো।

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার গেটে তালা ঝুলছে। কয়েকটি গেটে মরিচা ধরেছে। গতকাল অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনেরা এসব গেট ও তালা ভেঙে বের হয়েছেন। কয়েকটি গেট এখনও ভাঙা অবস্থায় আছে।

ময়মনসিংহ নগরের চর ঈশ্বরদিয়া গ্রামের জোবেদা খাতুন গত রবিবার হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি হন। তিনি হাসপাতালের করিডরে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ভবনের ভেতরে থাকা মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গেট তালাবদ্ধ ছিল। পরে মানুষ তালা ও গেট ভেঙে বাইরে বের হন।

জোবেদা খাতুন বলেন, ‘আগুন দেখে মনে হচ্ছিল কেউ বাঁচবে না। পরে মানুষ দৌড়াদৌড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। গেটগুলো খোলা থাকলে কষ্ট অনেক কম হতো।’

হাসপাতালের ছয়তলার ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু বিভাগে ভাতিজিকে নিয়ে ভর্তি আছেন তারাকান্দার মনির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত মানুষ বিভিন্ন জায়গা দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় ভাঙা বেড, বেডশিটসহ বিভিন্ন জিনিস সিঁড়িতে পড়ে থাকায় অনেকে আহত হন। নামার সময় একজনের ওপর আরেকজন পড়ে যাচ্ছিলেন। শিশুদের নিয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সব সিঁড়ি খোলা থাকলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না।’

হাসপাতালের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাসপাতালের ইনডোরে প্রায় চার হাজার রোগী ভর্তি থাকে। আর আউটডোরে প্রায় পাঁচ হাজার রোগী প্রতিদিন চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এত সংখ্যক রোগীর জন্য যেসব লিফটের ব্যবস্থা আছে, তা অনেকটাই কম। এ ছাড়া যে লিফটগুলো আছে এর মধ্যে বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। তারপর সিঁড়িগুলোর গেটে তালা দিয়ে রাখা হয়। বিশেষ করে হাসপাতালে ওষুধ পর্যাপ্ত না থাকায় রোগীর স্বজনদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয় এবং বারবার যেতে হয়। এ কারণে একটি সিঁড়ি খোলা থাকায় সব সময় ভিড় লেগেই থাকে সেখানে। আগুন লাগার পর সেখানে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গিয়েছিল কাল। মানুষ বাঁচার জন্য যে যেভাবে পেরেছে, বের হয়ে গিয়েছিল। সবগুলো সিঁড়ি খোলা থাকলে হয়তো আগুন লাগার সময় এতটা ভয় পেতে হতো না। রোগী আর স্বজনরা বাইরে বের হতে পারতেন সহজে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয় না কখনও।

আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিলআগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল

ময়মনসিংহ জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক আলী ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতালের লিফটে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনরা বাইরে বের হওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়েছেন, এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কারণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটি তালাবদ্ধ করে রেখে একটি মাত্র সিঁড়ি চালু রেখেছিল। এটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি বলে আমরা মনে করি। এ কারণেই রোগী ও স্বজনদের চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে। এই ঘটনার দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

যা বলছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারও কোনও গাফিলতি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। যদি কারও গাফলিতি থাকে অবশ্যই তদন্তে বের হয়ে আসবে এবং কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি ও সাতটি লিফট রয়েছে। সাতটি লিফটের মধ্যে একটি বিকল ছিল এবং সেটি মেরামতের কাজ চলছিল। ওই লিফটের কন্ট্রোল রুমেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে জানিয়েছে। তবে সেটিই আগুন লাগার কারণ কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। এরপর আমরা ব্যবস্থা নেবো।’

হাসপাতালের লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদফতরের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় ১১ নম্বর লিফটটি সচল ছিল না, এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ ছিল। সেখানে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আজ তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। এরপর বিস্তারিত তদন্ত করে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

/এএম/

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com