সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

লোডশেডিংয়ের সুযোগে ট্রান্সফরমার চুরির হিড়িক

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

তীব্র গরম এবং দেশজুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির সংঘবদ্ধ চক্র সারা দেশে পল্লী বিদ্যুতের প্রায় কয়েক হাজার ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়েছে। রাতের আঁধারে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে ভারী ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে ভেতরের মূল্যবান তামার তার ও যন্ত্রাংশ হাতিয়ে নিচ্ছে চোরেরা, আর ফাঁকা খোলসটি ফেলে রেখে যাচ্ছে মাঠ বা রাস্তার পাশে।

এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে চরম বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে, যা জনজীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। আশঙ্কাজনক চিত্র ও বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতিদেশের উত্তর, পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো তথ্য নেই। সারা দেশে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, লোডশেডিং শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপক হারে চুরি শুরু হয়। এর মধ্যে চাঁদপুর, জামালপুর, দিনাজপুর, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁও ও মাগুরা উল্লেখযোগ্য।

চাঁদপুর: জেলার মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা চরম আকার ধারণ করেছে। কেবল মতলব উত্তর উপজেলায় দেড় মাসে প্রায় দুই ডজন (২৩টি) ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। যার ফলে, অনেক এলাকা টানা কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।  চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. নাঈম জানান, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতরা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। কারণ, বিদ্যুৎ লাইনে সংযোগ থাকা অবস্থায়ও তারা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে।

জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে বলে তারা ধারণা করছেন। চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এরপর প্রত্যন্ত ও নির্জন স্থান থেকে ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যায়। পরে সেগুলো ভাঙারিপট্টিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ট্রান্সফরমার চুরির প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন করতে প্রত্যন্ত এলাকায় মাইকিং, উঠান বৈঠক, বিশেষ সভা ও গণশুনানি করা হচ্ছে।

ফেনী ও জামালপুর: ফেনী জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে শতাধিক ট্রান্সফরমার চুরির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া জামালপুর, দিনাজপুর, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁও ও মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার উধাও হয়ে যাওয়ার নিত্যদিনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা।

দিনাজপুর: গত এক বছরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় চার শতাধিক ট্রান্সফরমার চুরির রেকর্ড রয়েছে। বারবার একই গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের ট্রান্সফরমার চুরির শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।  টার্গেটে মূলত বাণিজ্যিক ও সেচ সংযোগ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চোর চক্রটি সাধারণত আবাসিক এলাকার চেয়ে গভীর নলকূপ, স-মিল, রাইস মিল, পোলট্রি খামার কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত তুলনামূলক ভারী ও বড় ক্ষমতার (১০ থেকে ২৫ কেভিএ বা তদূর্ধ্ব) ট্রান্সফরমারগুলো বেশি টার্গেট করছে। কারণ, এসব ট্রান্সফরমার থেকে অধিক পরিমাণে মূল্যবান তামার তার ও কয়েল পাওয়া যায়, যা অবৈধ ভাঙারিবাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।

গ্রাহক ও কৃষকদের মাথায় হাত 
একাধিকবার ট্রান্সফরমার চুরির কারণে বোরো সেচ কার্যক্রম, ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পঙ্গু হয়ে পড়েছে। নিয়মানুযায়ী চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারের আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থ দিয়ে নতুন সংযোগ নিতে গিয়ে কৃষকরা আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মাস পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুৎ বিভাগের নতুন সংযোগ বা প্রতিস্থাপনের দেখা মেলে না। ফলে, চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ গ্রাহকদের।

অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের অভিযোগ বনাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের মতে, বৈদ্যুতিক খুঁটির উঁচুতে থাকা এত ভারী এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন একটি যন্ত্র সাধারণ চোরের পক্ষে নামানো অসম্ভব। লাইনে বিদ্যুৎ না থাকার সময় জেনেই এই চুরিগুলো সংঘটিত হয়, যার পেছনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কোনো অসাধু চক্র বা অভিজ্ঞ লাইনম্যানদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানার ওসি মো. কামরুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান, ‘অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোক ছাড়া বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি সম্ভব নয়। ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় বিদ্যুৎ বিভাগের লোকেরাই জড়িত।’ তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, লোডশেডিংয়ের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পেশাদার চোরেরা অভিনব কৌশলে এই চুরি করছে। চুরি রোধে গ্রাহকদের সচেতন করতে মাইকিং, উঠানবৈঠক এবং পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের এই সংকটকালে ট্রান্সফরমার চুরি রোধে কেবল সাধারণ সতর্কতা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে জড়িত আন্তঃজেলা সিন্ডিকেট ও অবৈধ ভাঙারি দোকানগুলোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা এবং বিদ্যুৎ অফিস ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে রাত্রিকালীন টহল আরো জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে একটি সুসংগঠিত আন্তঃজেলা অপরাধী চক্র বা সিন্ডিকেট জড়িত বলে বিভিন্ন তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এই চক্রটি মূলত কয়েকটি স্তরে বিভক্ত হয়ে কাজ করে।

চোররা পেশাদার ও কারিগরি দক্ষ 
বৈদ্যুতিক খুঁটির উঁচুতে থাকা শত শত কেজি ওজনের একটি ভারী ট্রান্সফরমার নিরাপদে নামানো সাধারণ চোরের পক্ষে অসম্ভব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের মতে, এই চক্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা বিদ্যুৎ লাইন বা কারিগরি কাজের সাথে পরিচিত। কখন নির্দিষ্ট এলাকায় লোডশেডিং থাকবে বা লাইন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে, সেই গোপনীয় তথ্য জেনেই তারা নিখুঁতভাবে এই চুরিগুলো করে।

পল্লীবিদ্যুতের অসাধু অভ্যন্তরীণ চক্র
ভুক্তভোগী গ্রাহক, এলাকার প্রতিনিধি এবং পুলিশের একটি অংশের জোরালো অভিযোগ রয়েছে, এই চুরির নেপথ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী কিংবা লাইনম্যানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ থাকতে পারে। কোন এলাকায় কবে ও কখন লোডশেডিং হবে, সাব-স্টেশনের কোন ফিডারের লাইন কখন বন্ধ রাখা হয়— এই অভ্যন্তরীণ তথ্যগুলো চোরচক্রের কাছে পাচার না হলে রাতের অন্ধকারে এমন নিখুঁত চুরি করা কঠিন। অবশ্য পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

চোরা কারবারি ও ভাঙারি সিন্ডিকেট 
চুরি করা ট্রান্সফরমারগুলো আস্ত কোথাও বিক্রি করা হয় না। চোরেরা রাতের আঁধারে সেগুলোকে নিরিবিলি স্থানে বা মাঠের মধ্যে নিয়ে হাতুড়ি বা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ভেঙে ভেতরের দামি তামার তার, কয়েল ও অ্যালুমিনিয়াম বের করে নেয়। এরপর এই মূল্যবান তামাগুলো অবৈধ ভাঙারি দোকান বা অসাধু মেটাল ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। এই ভাঙারি সিন্ডিকেটগুলো পুরো চুরির অন্যতম প্রধান অর্থ জোগানদাতা ও ক্রেতা।

স্থানীয় অপরাধী ও পরিবহন চক্র
ভারী ট্রান্সফরমারগুলো দ্রুত স্থানান্তরের জন্য চক্রটি পিকআপ ভ্যান, ট্রাক কিংবা স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করে। অনেক সময় স্থানীয় অপরাধী চক্রের ছোট দলগুলো রেকি করে বা এলাকা নজরদারি করে জানায় কোথায় কোন সেচপাম্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রান্সফরমার অরক্ষিত অবস্থায় আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, অভ্যন্তরীণ তথ্যদাতা (সম্ভাব্য অসাধু বিদ্যুৎকর্মী), কারিগরি দক্ষ চোরদল, পরিবহন সহায়তাকারী এবং চোরাই তামার ক্রেতা ভাঙারি ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িত। পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির এই অপকর্মের পেছনে সাধারণ কোনো চোর নয়, বরং একটি লাভবান সিন্ডিকেট কাজ করে।

অবৈধ ভাঙারি ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা
এই চুরির প্রধান ও সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হলো অবৈধ ভাঙারি ও মেটাল ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট। ট্রান্সফরমার ভেঙে ভেতরের যে কয়েক কেজি মূল্যবান তামার তার ও কয়েল পাওয়া যায়, তা খোলাবাজারে অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করা হয়। চোরেরা পানির দরে বা খুব কম দামে এগুলো ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করলেও, ব্যবসায়ীরা তা চোরাই পথে বা গলিয়ে আরো বেশি লাভে বিক্রি করে।

পেশাদার চোর চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগী 
যেহেতু চোরেরা রাতের আঁধারে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করে, বিনিময়ে তারা ভাঙারি চক্র বা অপরাধী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নগদ অর্থ পায়। বেকার বা অপরাধ জগতের সাথে জড়িত এই পেশাদার চোরেরা কোনো বৈধ পরিশ্রম বা বিনিয়োগ ছাড়াই অল্প সময়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।

অসাধু ঠিকাদার ও বিদ্যুৎ উপকরণের অবৈধ বাজার 
চুরি যাওয়ার পর কৃষকরা বা ব্যবসায়ীরা যখন নতুন ট্রান্সফরমার নেওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করেন, তখন একশ্রেণির অসাধু চক্র বা দালাল শ্রেণি লাভবান হয়। অনেক সময় পুরনো ট্রান্সফরমার মেরামত করে বা নতুন সংযোগের নামে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এদিকে পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির এই হিড়িকে সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহক, কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। চোর চক্রের কয়েক মুহূর্তের অপকর্মের কারণে একজন সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

কৃষকদের বোরো সেচ ও উৎপাদন ব্যাহত
চোরদের প্রধান টার্গেট থাকে গভীর নলকূপ ও সেচপাম্পের ট্রান্সফরমারগুলো। ভরা সেচ মৌসুমে যখন পানির তীব্র প্রয়োজন, ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে গেলে কৃষকদের মাথায় হাত পড়ে। সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পেরে চোখের সামনে নষ্ট হয় সোনার ফসল। বোরো ধান বা অন্যান্য ফসল ফলানোর জন্য কৃষকদের ঋণের টাকা বা ধারদেনা করে সেচপাম্প সচল রাখতে হয়, যা এই চুরির কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপর্যয়
রাইস মিল, স-মিল, করাতকল, পোলট্রি খামার কিংবা বরফকলের মতো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ট্রান্সফরমার চুরির কারণে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়। দিনের পর দিন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকে, অথচ শ্রমিকদের বেতন, ঘরভাড়া ও ব্যাংক ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। এতে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে চিরতরে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন।

আর্থিক ও মানসিক হয়রানি (ডাবল জাঁতাকল) 
একটি ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর গ্রাহককে নতুন করে সংযোগ পাওয়ার জন্য লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী থানায় জিডি করা, জিডি কপি বিদ্যুৎ অফিসে জমা দেওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমার বা তার মূল্যের নির্দিষ্ট অংশ গ্রাহককে বহন করতে হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ অফিস থেকে নতুন ট্রান্সফরমার পেতে ও তা স্থাপন করতে অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে যায়।

এই পুরো সময়ে গ্রাহককে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় এবং দ্রুত ট্রান্সফরমার পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দালাল বা অসাধু চক্রের ফাঁদে পড়ে অতিরিক্ত অর্থ গুণতে হয়, যা নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক মানুষের জন্য অসম্ভব এক অর্থনৈতিক চাপ। টানা কয়েক দিন বা সপ্তাহ বিদ্যুৎহীন থাকায় এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে গরমের দিনে বৃদ্ধ, শিশু ও ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাছাড়া রাতের আঁধারে চোর চক্রের এই অবাধ দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে।

এ বিষয় পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা চুরির সাথে যোগসাজশের অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, রাতের আঁধারে লোডশেডিংয়ের অন্ধকার ও ফাঁকা জায়গার সুযোগ নিয়ে পেশাদার চোরেরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই অপরাধ করছে। এছাড়া চুরি রোধ করতে সমিতির পক্ষ থেকে গ্রাহকদের সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এলাকায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং উঠানবৈঠক করে ট্রান্সফরমারগুলোর নিরাপত্তা নিজে পাহারার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর জিএম মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘চুরির ঘটনায় কেউ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাথে জড়িত নয়। ট্রান্সফরমার চুরি রোধে গ্রাহকদের উদ্ধ‍ুদ্ধ করার পাশাপাশি পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। কোনো গ্রাহকের ট্রান্সফরমা চুরি হলে প্রথম চুরির ক্ষেত্রে ট্রান্সফরমারের অর্ধেক মূল্য নেওয়া হয়।

চোরচক্রকে শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা। এ বিষয় পুলিশের তদন্তে ও স্থানীয় থানায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, বৈদ্যুতিক খুঁটির উঁচুতে থাকা এত ভারী এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন যন্ত্র সাধারণ চোরের পক্ষে নামানো অসম্ভব। সুনির্দিষ্ট লোডশেডিংয়ের সময় ও সাব-স্টেশনের তথ্য ছাড়া এই চুরি সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।

পুলিশ প্রশাসন বলছে, ট্রান্সফরমার চুরির সাথে জড়িত আন্তঃজেলা চক্র ও চোরাই তামার ক্রেতা হিসেবে অবৈধ ভাঙারি দোকানগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় অভিযান চালিয়ে চোর চক্রের সদস্য ও চোরাই মালামাল উদ্ধারের দাবিও করেছে পুলিশ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর থানায় জিডি করা থেকে শুরু করে নতুন সংযোগ পেতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। উপরন্তু, বিদ্যুৎ অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসহযোগিতা ও দীর্ঘসূত্রতায় তাদের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।

পল্লীবিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির ব্যপারে কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা চুরির সাথে যোগসাজশের অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, রাতের আঁধারে লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে এবং গ্রামীণ এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানের ফায়দা লুটে পেশাদার চোরেরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই অপরাধ করছে। এর সাথে বিদ্যুৎ অফিসের ভেতরের কারো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি তাদের।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং রাতের অন্ধকারের কারণে চোরেরা খুব সহজেই ফাঁকা জায়গায় থাকা সেচপাম্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রান্সফরমারগুলো টার্গেট করতে পারছে। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক লোডশেডিং ভেবে বিষয়টি খেয়াল করে না, আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। কর্তৃপক্ষের মতে, বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার ট্রান্সফরমার সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া বা নজরদারি করা তাদের সীমিত জনবল দিয়ে অসম্ভব। তাই তারা মূলত গ্রাহক এবং স্থানীয়দের নিজ দায়িত্বে ট্রান্সফরমারগুলো পাহারা দেওয়ার বা সুরক্ষার আহ্বান জানাচ্ছেন। পাশাপাশি ট্রান্সফরমার চুরিরোধে খুঁটির সাথে লোহার খাঁচা বা বিশেষ লকিং ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিতরণ ও পরিচালন বিভাগের সদস্য ( চলতি দায়িত্ব)  মো. শফিকুর রহমান এদিনকে বলেন, আমাদের কাছে এ ব্যপারে অনেক অভিযোগ আছে। আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এছাড়া বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমকে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি খুদে বার্তা দিয়ে কোনো উত্তর মেলেনি।

এসএফ

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com