পৃথিবীর জীবাশ্ম জ্বালানির ভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সারা বিশ্বে জ্বালানিসংকট তীব্র হচ্ছে।এ ছাড়া জ্বালানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ এসব পরিস্থিতির বাইরে নয়। বরং আমদানিনির্ভর হওয়ায় আমাদের জ্বালানি খাত তুলনামূলক বেশি ধুঁকছে।বিশেষ করে জ্বালানির অভাবে বহু শিল্প-কারখানা বন্ধের উপক্রম। বাসাবাড়িতে চুলা ঠিকমতো জ্বলছে না। এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এমনকি রুফটপ সোলার (ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ) শিল্প খাতেও বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে।গতকাল কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, শিল্প-কারখানার বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
সৌরবিদ্যুতের অন্যতম সুবিধার দিক হলো, উৎপাদন খরচ কম। আবার সরবরাহের অনিশ্চয়তাও অনেকখানি কম। খবরে বলা হয়, বর্তমানে শিল্প-কারখানায় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৫৬ পয়সা। এর বিপরীতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ক্যাপেক্স মডেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়ছে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার টাকা।আর অপেক্স মডেলে প্রতি ইউনিটের খরচ সাত থেকে আট টাকার মধ্যে। ফলে গ্রিড বিদ্যুতের তুলনায় ক্যাপেক্স মডেলে প্রতি ইউনিটে ৭ টাকারও বেশি এবং অপেক্স মডেলে প্রায় তিন থেকে সাড়ে চার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
উৎপাদন খরচ ও সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া আরো কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় আমাদের সামনে এসেছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘শিল্পে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার পেছনে শুধু বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোই নয়, আরো কয়েকটি কারণ রয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পক্ষ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের শর্ত বা চাহিদা রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যও অনেক রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছে।’
লক্ষণীয় বিষয় হলো—শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সাম্প্রতিক সময়ে করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। আগে ক্যাপিটাল মেশিনারির আওতায় মাত্র ১ শতাংশ কর দিয়ে এসব সরঞ্জাম আমদানি করা যেত। বর্তমানে এসব সরঞ্জামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। এতে রুফটপ সোলার প্রকল্পের কার্যকর করের হার ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়েছে। এতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি শিল্প মালিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বলা হচ্ছে, ২০ বছর মেয়াদি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিপরীতে ১০ থেকে ১২ বছর মেয়াদে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হলে শিল্পগুলো দ্রুত সৌরবিদ্যুতে যেতে পারবে।
আশার কথা হলো, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সরকার রুফটপ সোলারে আগ্রাসিভাবে এগোচ্ছে। আমি মনে করি, এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, অদূর ভবিষ্যতে স্মার্ট বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রাধান্য পাবে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলসহ প্রতিবেশী অনেক দেশ এ খাতে এগিয়ে গেছে। আমাদেরও উচিত সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া। আশা করি, সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল এ বিষয়ে কালক্ষেপণ না করে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।