মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সংকটে পোশাক শিল্প চাকরি ও হারাতে যাচ্ছে শ্রমিকরা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপের বাজারেও আধিপত্য হারাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। বড় দুটি বাজার হারিয়ে দিশাহারা অবস্থায় পড়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। কার্যাদেশ না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি কারখানা। চালু থাকা অধিকাংশ কারখানা লো-ক্যাপাসিটিতে অপারেশন চালাচ্ছে।

দক্ষিণএশীয় কালচারাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া

বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। শ্রমিক নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের বিভিন্ন বায়িং প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চার হাজার ১১০ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছে ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরোর পোশাক।

গত বছরের একই সময়ে ইউরোপে রপ্তানি হয়েছিল এক হাজার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক। এক বছরের ব্যবধানে অন্যতম বড় এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৬.৪৩ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৭৫ শতাংশ কম।

বড় বাজারগুলোর নিম্নমুখী এই চিত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের শিল্পকারখানায়। এই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি তেল-গ্যাসের তীব্র অভাবসহ নানামুখী সংকটের কারণে সহসা সুখবর পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন না তারা। এরই মাঝে ছোট-বড় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অর্ডার না থাকার কারণে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো।

নগরীর পাহাড়তলী এলাকায় আরটিটি টেক্সটাইল কারখানায় অপারেটরের কাজ করতেন শিরিনা বেগম। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, চাকরি করে অতিরিক্ত কাজের টাকাসহ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন পেতাম। এখন বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি, বাচ্চাদের নিয়ে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করাটাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

শিরিনা বলেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ছেলেমেয়ে নিয়ে অর্থকষ্টে দিন পার করছি। রিকশাচালক স্বামী অসুস্থ হওয়ায় কষ্ট আরো বেড়েছে।

শিরিনার মতো চট্টগ্রামের শান গার্মেন্টস, ওমামা ফ্যাশনসহ বিভিন্ন কারখানার চাকরি হারানো হাজারো শ্রমিক বেকার হয়েছেন। অনেক শ্রমিক তাদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। পেশা পরিবর্তন করে এখন অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাজ করেন রুবেল। তিনি বলেন, চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন কাজ ছিল না। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দুই মাসেও চালু না হওয়ায় বাধ্য হয়ে এখানে কাজ করছি। পাওনা পরিশোধের বিষয়ে রুবেল বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করেছি। নিয়মানুযায়ী আমরা টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু মালিক আমাদের এক টাকাও দেননি।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ২৫টি, বাকি ২৫টি সাময়িক বন্ধ রয়েছে। কারখানাগুলোয় কাজ করা সাত হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।

তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত কিংবা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। এদের অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপার মাহমুদা বেগম সোনিয়া বলেন, ছাঁটাইকৃত শ্রমিক এবং কারখানা মালিকদের অভিযোগগুলো আমরা বসে সমাধানের চেষ্টা করেছি। কারখানাগুলো বন্ধের কারণ হিসেবে মালিকরা কাঁচামাল সংকট ও বৈশ্বিক কারণকে দায়ী করেছেন। এছাড়া শ্রমিকদের অসদাচরণ ও আর্থিক সংকটের কথাও বলেছেন মালিকরা।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান বলেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিক ছাঁটাই, জোরপূর্বক চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। গত ছয় মাসে সেটা আরো বেড়েছে। একটি কারখানায় ১০-১৫ বছর ধরে চাকরি করলেও আইনানুযায়ী শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য পাচ্ছেন না। অনেক সময় বিনা নোটিসে তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়

তিনি বলেন, শ্রমিকদের অভিযোগগুলো নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় কারখানা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করি। কিন্তু বেশিরভাগ অভিযোগের বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে না পারা, অতিরিক্ত কটনভিত্তিক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যান মেইড ফাইবার বা এমএমএফ পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ খাতে সীমিত সক্ষমতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলো। অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের কার্যাদেশ হারিয়ে ইউরোপের বাজারে আধিপত্য করছে। এছাড়া ভিয়েতনাম ও ভারত ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে এগিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি দেশের চলমান জ্বালানি সংকট, বন্দর-কাস্টমের প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং লিড টাইমও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন, দেশের চলমান জ্বালানি সংকট, ইউরোপের দেশগুলোয় প্রতিযোগী দেশগুলোর বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা। ফলে দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ কমে যাচ্ছে। কিছু কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানায় আংশিক উৎপাদন চলছে। ফলে কারখানাগুলোয় শ্রমিক ছাঁটাই, অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, ছুটি ঘোষণাসহ বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস লিমিটেডের মালিক এসএম আবু তৈয়ব জানান, বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে। কার্যাদেশ কমার পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। বাকি কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। ইতোমধ্যে শ্রমিকরা অতিরিক্ত কাজ করে যে টাকা পেতেন, সেটার সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে বাকি কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাবে।

কার্যাদেশ কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পোশাকশিল্প নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণ করে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। ভিয়েতনাম এগিয়ে থাকার বিষয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, কাঁচামালের সবচেয়ে ভালো গন্তব্য হচ্ছে চীন। আমাদের চীন থেকে কাঁচামাল আনতে সময় লাগে ১৮ থেকে ২৫ দিন, প্রতিযোগী দেশ বিশেষ করে ভিয়েতনাম পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে এটা সংগ্রহ করতে পারে। ফলে তারা দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সেলিম উদ্দিন জানান, বর্তমান সংকটকে সামলাতে হলে বিশেষ রেজল্যুশনের ঘোষণা করে আমাদের বর্তমান বিনিয়োগকে রক্ষা করতে হবে। আমরা যদি এই বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে না পারি, তাহলে বহুমুখী সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে দেশকে। বৈদেশিক আয় কমে গেলে রাষ্ট্র তার রাজস্ব হারাবে। তখন রাষ্ট্র বহুমুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে যাবে।

সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, কয়েক গুণ বেশি দামে হলেও বাইরের দেশগুলো থেকে দ্রুত এলএনজি কিনে উৎপাদন চলমান কারখানাগুলোর জ্বালানি সংকট সমাধান করতে হবে। উৎপাদন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে জনবল ছাঁটাই করতে হবে। এতে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com