রাজধানীর কালশী মোড়। ব্যস্ত সড়ক।মোড় থেকে মিরপুর ১২ নম্বর যেতে ৩০ কদম এগোলে সড়ক বিভাজক। সেখানে তিন যুবক বসা। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, তাঁরা গল্প করছেন; কিন্তু কাছাকাছি গেলে চিত্র বদলে যায়। সড়ক বিভাজকের পাশ দিয়ে বাসায় যাচ্ছিলেন সাদ্দাম হোসাইন।হাঁটছিলেন, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। সড়ক বিভাজকে বসা এক যুবক সাদ্দামের উদ্দেশে বলেন, ‘কয়ডা লাগবে?’
সাদ্দাম দাঁড়িয়ে পড়েন। জানতে চান, ‘কী লাগবে?’ তখন যুবক বলেন, ‘গুটি লাগবে?’ সাদ্দাম বুঝতে পারেন, তাঁকে ডেকে ইয়াবা কেনার কথা বলা হচ্ছে। বিরক্ত হয়ে হাঁটা ধরেন তিনি।
ঘটনাটি গত মঙ্গলবার বিকেলের। ঘটনার সময় কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদক সেখানে ছিলেন। কিছুদূর এগিয়ে সাদ্দাদ বলেন, ‘কাজ শেষে বাসায় যাচ্ছি। সেই সময় আমাকে ডেকে ইয়াবা কিনতে বলছে! মেজাজ যা খারাপ হলো! ভাবা যায়, ডেকে ডেকে মাদক বিক্রি করছে! তাদের শক্তি আছে, যে শক্তির বলে কাউকে তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে ব্যস্ত রাস্তায় মাদক বিক্রি করছে।’
সাজ্জাদ চলে যাওয়ার একটু পর তাঁদের কাছ থেকে একজন ইয়াবা কিনে দ্রুত চলে যান।শুধু এই তিনজন নন, আরো অনেকে দিনের পর দিন এভাবে মাদক বিক্রি করে চলেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে সড়ক বিভাজকের পাশের ফুটপাতে এক কিশোর ঘোরাঘুরি করছিল। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ইয়াবা আছে কি না।
কিশোর বলল, ‘রাস্তার ওই পাশে যান। আমি আইতাছি। ভাইবেরাদর থেকে লইয়া দিতে হবে।’ ওই পাশে যাওয়ার পর কিশোর বলল, ‘চলেন, বস্তির (বালুর মাঠ) মধ্যে যাই। ওইখানে গেলে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা—সব পাওয়া যাবে। টাকা দেন, যত লাগব, দেওন যাইব। আমাগোর পরিচিত লোক আছে।’ তখন এই প্রতিবেদক এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার কথা বলে জায়গা ত্যাগ করেন।
আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার দুপুরে বালুর মাঠ বস্তির কোণে কালশী ফ্লাইওভারের নিচে অনেককে দেখা যায়। তাদের মধ্যে একজন ইয়াবা, আরেকজন প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি করছিলেন। কয়েকজন বসে গাঁজা সেবন করছিলেন। সেখানে থাকা একজন নিজেকে রিকশাচালক বলে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘রিকশা চালাই, মাঝেমধ্যে টানি। কেউ গাঁজা-গুটি চাইলে আইনা দিই। সেখান থেকে আমার খাওয়ার টাকাও বের হয়। অনেক ধনী লোক আসে এখানে। মাঝেমধ্যে মিল্লাত ক্যাম্পে গিয়া নিজে কিনি, অন্যদেরও কিনা দিই।’
কালশী এলাকার বাসিন্দারা এসব দেখে বিরক্ত। তাদের কয়েকজন আক্ষেপ করে জানান, কেউ এসব বন্ধে এগিয়ে আসে না; বরং দিন দিন মাদক কেনাবেচা বাড়ছে। মাদকে জড়িত কারো বিরুদ্ধে কথা বললে ঝামেলায় পড়তে হয়।
নাজিবুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘মাদক নিয়ে কিছু বলা যাবে না। বললে বস্তিতেই থাকতে পারব না। নিজের ছেলেটাও খারাপ পথে যাচ্ছে। অথচ মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ নেই আমার। আগের চেয়ে ইয়াবার বেচাকেনা অনেক বেড়েছে।’
রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ছোট-বড় ৩৯টি ক্যাম্প রয়েছে। পুলিশের দাবি, বেশির ভাগ ক্যাম্পে মাদক কারবার চলছে। তার মধ্যে মিরপুর ১১ নম্বরের ‘বি’ ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের পশ্চিম পাশের মিল্লাত ক্যাম্প অন্যতম।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মিল্লাত ক্যাম্পের বেশির ভাগ গলি সরু। নির্দিষ্ট কিছু গলি দিয়ে ঢুকলেই মাদক বিক্রেতা বুঝতে পারেন যে কিনতে এসেছে।
গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে ক্যাম্পের একটি গলিতে একজন ক্রেতা ঢোকেন। তাঁকে দেখে এক বিক্রেতা ঘর থেকে বেরিয়ে জানতে চান, ‘কয়টা লাগবে?’ ক্রেতা গাঁজা আর ইয়াবা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যান ক্যাম্প থেকে। ওই ক্যাম্পে রাত-দিন এভাবে বিকিকিনি চলে।
গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল—সব মেলে মিল্লাত ক্যাম্পে। গলির মুখগুলোতে বিক্রেতাদের সহযোগীরা দাঁড়িয়ে থাকেন, কে ঢুকছে কে বের হচ্ছে তা দেখতে। বিকেলে সেখানে বাড়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা। ক্যাম্পের ভেতরে এমন কিছু ঘর রয়েছে, যেখানে গিয়ে নিয়মিত মাদক সেবন করে অনেকে। ক্যাম্পজুড়ে মাদক বিক্রেতাদের বড় বলয় রয়েছে। কারা মাদক বিক্রি ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত, তা নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।
তালেব উদ্দিন নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘এখানে কারা এসব করে, তা পুলিশ প্রশাসন জানে। তার পরও তাদের কিছু হয় না। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলবে কে? বললে টিকতে পারব এখানে?’
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘রাজিয়া খাতুন এখানকার বড় ডিলার। তার অধীনে অনেকে মাদক বিক্রি করে।’
ক্যাম্পগুলোর অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ঢাকা-১৬ আসনের (পল্লবী-রূপনগর) সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পগুলো মাদক কারবারিতে ভরে গেছে। এসব দেখে ছেলেপুলেরা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা কিছু করতে পারছি না। ক্যাম্পের বাইরের বিভিন্ন ফুটপাতেও হরহামেশা মাদক মেলে। এসব বন্ধ করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে।’
সম্প্রতি ঢাকার ৫০ থানার মাদক কারবারিদের তালিকা হালনাগাদ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর। ওই তালিকায় মোট ৩৬৩ জন মাদক কারবারির নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় ১৭ জন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওই ১৭ জন লোক দিয়ে খুচরা পর্যায়ে মাদক বিক্রি করেন।
মিরপুর পুলিশ বলছে, এসব তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি ধরা পড়লে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে জামিন পান।
মাদকের অবাধ বিক্রির বিষয়ে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পল্লবী এখন মাদকের বড় আখড়া। আমাদের অভিযান থেমে নেই। যাদের ধরি, তারা জামিন পেয়ে আবার একই কাজ শুরু করে। কয়েক দিন আগে ল্যাংড়া রুবেল নামের একজনকে আমরা ধরেছি, যে পল্লবীর সবচেয়ে বড় মাদক কারবারি; কিন্তু তাদের চেইন থেকে গেছে।’
পল্লবী থানার ওসি হাসান বশীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পল্লবী একেবারে মাদকে ভরে গেছে। পল্লবীতে ৩৯টি ক্যাম্প এবং ১০টি বস্তি আছে। বস্তি ও ক্যাম্পের লোকজন একেবারেই নিয়ম মানতে চায় না। লেখাপড়াও শেখে না বেশি। যে শিশু আজ দেখছে তার পরিবারের মানুষ মাদক বিক্রি করে, আগামী দিনে তারও তা-ই করার শঙ্কা বেশি। গত জুলাইয়ে মাদক মামলায় ৭০০-এর মতো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছি; কিন্তু ওরা জামিনে জেল থেকে বেরিয়ে আবার একই কাজ করে। ওদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে পুলিশের ঝামেলাও হয়। এই মাদক বন্ধ করতে সামাজিক সচেতনতা ছাড়া উপায় নেই। নতুবা সীমিতসংখ্যক ফোর্স নিয়ে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়।’