বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে আর মাত্র দুই দিন বাকি। এই সময়ে স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে সরকার ২৫টি উদ্যোগ নিয়েছে।এর মধ্যে সরাসরি বাস্তবায়িত হয়েছে চারটি, পাঁচটির কাজ শুরু হয়েছে এবং ১৬টি রয়েছে সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা, ঘোষণা বা প্রক্রিয়াধীন পর্যায়ে। সরকারের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ নতুন উদ্যোগ নেওয়া নয়, বরং ঘোষিত উদ্যোগগুলোকে দ্রুত হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মানবিক সেবায় রূপ দেওয়া।
সরকারের উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কাঁচামালে ভ্যাট-কর কমানো বা প্রত্যাহার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় নির্মিত ১৯২টি স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর এবং উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালে আনসার মোতায়েন।
এর বাইরে আরো দুটি সাফল্যের কথা বলা হয়েছে—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজকে বিশ্বমানের গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালিস্ট সেন্টারগুলোকে সচল ও কার্যকর করা।
এরই মধ্যে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর নকশা প্রণয়ন ও একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ১০ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট চালু, পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ এবং সমন্বিত প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবার নতুন মডেল তৈরির কাজও চলছে।
সরকারের ১৬ সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা : গত ছয় মাসে সরকার ১১টি সিদ্ধান্ত ও পাঁচটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এগুলো হলো ৩১ ও ৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা, উপজেলা হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাব স্থাপন, পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালু করা, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমাতে নতুন নীতি গ্রহণ, মিডওয়াইফ ও কেয়ারগিভার নিয়োগ, মাঠ পর্যায়ে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং চালু করা, চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের শূন্যপদ পূরণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় আনসার মোতায়েন, বৈজ্ঞানিকভাবে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গর্ভবতী মায়েদের দালালচক্র থেকে সুরক্ষা এবং প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা।
লক্ষ্য ও পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মাঠ পর্যায়ে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং সম্প্রসারণ, নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব বাড়ানো ও অপ্রয়োজনীয় সিজার কমানো, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবিক আচরণের মাধ্যমে রোগীর আস্থা ফেরানো এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে বিদেশমুখী চিকিৎসা কমানো।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রোডম্যাপ নিয়ে : জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ও স্পষ্ট রোডম্যাপ।বর্তমানে যার অভাব প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
তিনি বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো অনেকটাই কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি স্পষ্ট নয়।
তাঁর মতে, শুধু হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ালেই সেবার মান বাড়ে না। প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে নতুন ভবনও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে না। অতীতে এমন বহু হাসপাতাল হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে সেবা চালু হয়নি।
ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা : তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে পুরো স্বাস্থ্য খাতের বড় কোনো মূল্যায়ন করা কঠিন। কিছু রাজনৈতিক ঘোষণার অসামঞ্জস্য বাদ দিলে মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ৫৫ বছরের ঐতিহ্যে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৭ শতাংশে আটকে ছিল। এই অচলায়তন ভেঙে এবার বরাদ্দ বাড়িয়ে ১.২ শতাংশ করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে ৫ শতাংশে পৌঁছানোর প্রথম বড় নীতিগত পদক্ষেপ।
বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা : বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, ঘোষিত অগ্রাধিকার কত দ্রুত দৃশ্যমান সেবায় পরিণত হয়। এক লাখ হেলথ কেয়ারার ও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, উপজেলা হাসপাতাল সম্প্রসারণ, ডায়ালিসিস, আধুনিক ল্যাব, ক্যান্সার স্ক্রিনিং, ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড কিংবা নিরাপদ মাতৃসেবার মতো উদ্যোগ মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নির্ধারিত সময়ে জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো প্রস্তুত, যন্ত্রপাতি ও ওষুধ সরবরাহ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হলে অনেক উদ্যোগ মাঝপথে থেমে যায়। তাই ছয় মাসে নেওয়া উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতে এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নতুন উদ্যোগ ঘোষণা নয়; বরং ঘোষিত উদ্যোগকে দ্রুত, পরিমাপযোগ্য ও দৃশ্যমান সেবায় পরিণত করা। রোগীর হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধ এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা—এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেই ছয় মাসের ঘোষণাগুলোকে বাস্তব সাফল্য বলা যাবে।
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, “আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ‘অর্জন’ আসলে এক চরম স্থবিরতারই চিত্র। কোনো দৃশ্যমান উন্নতিও হয়নি, আবার অবনতিও ঘটেনি; অর্থাৎ খাতটি ঠিক আগের জায়গাতেই থমকে আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য হলো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে আমাদের চরম এবং অনস্বীকার্য ব্যর্থতা।”
তিনি বলেন, ‘হাম বা মিজলসের মতো একটি অত্যন্ত সাধারণ রোগ যখন আজকের দিনেও প্রায় ৯০০ শিশুকে আক্রান্ত করে ফেলে, তখন এই ব্যর্থতার দায় আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তবে এই ব্যর্থতার আবহের মধ্যেও সামনের দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে নতুন ও ইতিবাচক কিছু ঘটার সম্ভাবনাও রয়েছে।’