‘আধা ঘণ্টার রাস্তা। পরীক্ষার সময় দেড় ঘণ্টা আগে বাসা থেকে বের হতে হয়। এখান থেকে যারা শেরপুরে পরীক্ষা দিতে যায়, সবাই ভোগান্তিতে পড়েন। এখান দিয়ে যাতায়াতের সময় সারাক্ষণই আল্লাহর নাম নেই। কারণ কখন উল্টে যাবে বলা যায় না।’ এইচএসসি পরীক্ষার্থী মিম আক্তারের কথায় যাত্রীদের দুর্ভোগ, ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব মিলেমিশে একাকার। এই তরুণীকে গত ৩১ জুলাই পাওয়া যায় শেরপুরের সদর উপজেলার গাজীরখামার বাজার এলাকায়। শেরপুর-নালিতাবাড়ী বিকল্প সড়ক ধরে যাতায়াতে তাঁর মতো হাজারো যাত্রীকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর পৌর শহরের খোয়ারপাড় থেকে আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে নালিতাবাড়ী পৌর শহরের দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। তবে শেরপুর পৌর শহরের বটতলা মেঘনা মার্কেট থেকে নালিতাবাড়ী টেম্পোস্ট্যান্ড পর্যন্ত আরেকটি বিকল্প পথ আছে। এই পথের দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার হওয়ায় ওই অঞ্চলের মানুষ এটিই ব্যবহার করেন বেশি। তাদের চলাচলের সুবিধার্থে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১১ কোটি টাকা খরচে সড়কটি প্রশস্তকরণ ও সংস্কারের কাজ শুরু করে। ২০২০ সালে কাজটি শেষ হয়।
সড়কের আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় সড়কটি অল্প কিছুদিন পর থেকেই ভাঙতে শুরু করে। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে দুই উপজেলার চার ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অন্তত ২০ হাজার মানুষ। আড়াই বছর ধরে তারা চরম ভোগান্তির শিকার হলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি।
এরই মধ্যে গত সপ্তাহের উজানের ঢলে চেল্লাখালি নদীর পানির তোড়ে সড়টির গোল্লারপাড় এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া শেরপুর পৌর শহরের শেখহাটী, সদরের পাকুরিয়া, গাজীরখামার ও নালিতাবাড়ীর কলসপাড় ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় এই সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এ কারণে সপ্তাহ তিনেক ধরে এখান দিয়ে ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের মতো ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে আছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। খানাখন্দের কারণে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠে।
সরেজমিন দেখা যায়, সড়কটির শেখহাটী বাজার থেকে শুরু করে গজাইরা, গাজীরখামার, চৈতনখিলা শালচূড়া, বরাইট্টা, তারাগড় ও গোল্লারপাড় এলাকার প্রায় ৯ কিলোমিটার অংশ একেবারেই চলাচলের অযোগ্য। কার্পেটিং উঠে জায়গায় জায়গায় বড় গর্ত দেখা যায়। এবড়োখেবড়ো সড়কজুড়ে বেরিয়ে এসেছে ইট-সুরকি। গর্ত গর্তে জমে আছে কাদাযুক্ত পানি। ছোট যানবাহনগুলোও চলছে ধীরে।
বটতলা মেঘনা মার্কেট থেকে নালিতাবাড়ী টেম্পোস্ট্যান্ডে দিনে ১২-১৪ বার যাত্রী নিয়ে আসা-যাওয়া করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আব্দুল মান্নান। তাঁর ভাষ্য, আগে এই সড়কে দিনে ৯০-১০০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করত। রাস্তা খারাপ হওয়ায় ৭০-৭৫টি চলাচল করে। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যা শত শত।
আব্দুল মান্নান গত সোমবার জানান, সড়কটিতে এখন চলাচল করা খুবই কষ্টের। ঝাঁকুনি লেগে যাত্রীদের ছিটকে পড়ার অবস্থা হয়। তারা এলজিইডিকে অনেকবার জানালেও সুরাহা হয়নি। জেলা প্রশাসক ৫-৬ মাস আগে শেখহাটী, চৈতনখিলা ও গাজীরখামার বাজারে রাবিশ-বালু ফেলে খানাখন্দ ভরে দিয়েছিলেন। পরে সিএনজিচালিক অটোরিকশার ৯০ জন চালক, কিছু হ্যান্ডট্রলি ও ইজিবাইকের চালক ১০০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে গাজীরখামার বাজার, গজাইরা, চৈতনখিলা শালচূড়া, বরাইট্টা, তারাগড় এলাকায় রাবিশ ফেলে গর্ত ভরেছেন। কিন্তু গত সপ্তাহের প্রবল বর্ষণ ও উজানের ঢলে রাস্তার পিচ উঠে গেছে। ফলে এখন বড় বড় গর্তের কারণে যাতায়াত করতে ভয়াবহ দুর্ভোগের পড়তে হচ্ছে।
গোল্লারপাড় গ্রামের আবু বকর সিদ্দিক শিক্ষকতা করেন। তিনি বলেন, পাহাড়ি ঢলে চেল্লাখালি নদীর পানির তোড়ে তিন সপ্তাহ আগে এ সড়কটির একাংশ ভেঙে যায়। এ কারণে শেরপুরের দিকে মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলছে না। অ্যাম্বুলেন্সও যাতায়াত করতে পারছে না। এতে খুব সমস্যা হচ্ছে।
এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজে জড়িত। সারাবছরই তারা নানা ধরনের সবজির আবাদ করেন। সড়কের এই দশায় বেকায়দায় পড়েছেন এসব প্রান্তিক কৃষক। তারাগড় এলাকার কৃষক আনিসুর রহমান বলেন, রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় তারা সবজির ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। কারণ সময়মতো সবজি নিয়ে শেরপুর ও নালিতাবাড়ী বাজারে পৌঁছাতে পারছেন না। ইজিবাইক বা অটোরিকশায় পরিবহনে খরচও বেড়ে গেছে।
গাজীরখামারের বাসিন্দা আব্দুল করিম ঝিনাইগাতীর বাকাকুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর মতে, প্রতিটি সড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কারণ বর্ষাকালে পানি জমে সড়ক নষ্ট হয়ে যায়। নালিতাবাড়ীর সীমান্ত এলাকার লোকজনও শেরপুর জেলা হাসপাতালে এ সড়ক দিয়েই যাতায়াত করেন। এতে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যায়। যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী থেকে শুরু করে গুরুতর অসুস্থ লোকজনকে ভয়াবহ দুর্দশায় পড়তে হয়েছে।
গত সোমবার এলজিইডির নালিতাবাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী মো. শরাফ উদ্দীন জানান, সড়কটির নালিতাবাড়ী অংশ মেরামতের কাজ শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ টাকার প্রাক্কলন তৈরি হয়েছে। অনুমোদনের জন্য শিগগিরই ময়মনসিংহে পাঠানো হবে।
শেরপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আশরাফ বলেন, ‘ওই সড়কের শেরপুর অংশ একটি প্রকল্পে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেখি পারা যায় কিনা। আমরা তো প্রকল্পের বাইরে কিছু করতে পারি না। একনেকে প্রকল্প পাস হয়।’