নয়টি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের সম্মতিতে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতির মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর শেষ হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠক শেষে আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।
প্রথমে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এরপর তারেক রহমান দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও অর্জন তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণের জন্য আনোয়ার ইব্রাহিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম যে শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছিলাম, তা ছিল প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের। তাঁর আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি, জ্বালানি, শিক্ষা, পর্যটন, প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো খাতগুলো উঠে আসে। এর মধ্যে অভিবাসন ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ ও শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিশেষ করে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দিতে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধ করা এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও বিবেচনার জন্য তুলে ধরেন তিনি।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একমত হয়েছি, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাস পায়।’
সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ প্রক্রিয়াসহ বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়েছি এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত সহযোগিতার একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করা হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এসব দলিল বিনিময় করেন।
এদিকে গতকাল স্থানীয় সময় দুপুরে কুয়ালালামপুরের ‘শাংগ্রি লা’ হোটেলে তারেক রহমানের সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও সুসংহত হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম এই সফরটি ছিল ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বহিঃপ্রকাশ। সংবাদ সম্মেলনে তিনি সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
পাঁচ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার পাঁচটি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া ও এমএমসি পোর্ট। তিনি জানান, সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক হয়। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়। এরপর সীমিত পরিসরে খোলামেলা আলোচনায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিক উঠে আসে। পরে ডেলিগেশন পর্যায়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা হয়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেলিগেশন মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করে। পরে মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
অভিবাসনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তাগিদ
মাহদী আমিন বলেন, জনগণের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও রাজার সঙ্গে শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঐকমত্য পোষণ করেছেন অভিবাসনের ক্ষেত্রে ব্যয় যত কমানো যায়, অভিবাসনের ক্ষেত্রে যত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আনা যায় এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের সুরক্ষা যেন নিশ্চিত করা যায়। প্রধানমন্ত্রী সম্ভব হলে দ্রুততার সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য পুনরায় উন্মুক্তকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে আরও বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একমত হয়েছে। বিশেষ করে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কীভাবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা যায় এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মালয়েশিয়া কীভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মালয়েশিয়া কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়। ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সংলাপ, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও গঠনমূলক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানব পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের সরকার একত্রে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাত নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এবারের ঐতিহাসিক সফরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খাতগুলো হলো রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই ও সেমিকন্ডাক্টর, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ এবং তাদের কল্যাণে সহযোগিতা, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহায়তা সম্প্রসারণ। উল্লেখ্য, মোট ৯টি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্মতিতে ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতি ইস্যু করা হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে, বিশেষ করে প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাদের ইতিবাচক অবদানকে উভয় দেশ স্বীকৃতি দেয়। দুই দেশের সরকারপ্রধান শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণে একমত পোষণ করেন। একই সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন উভয় সরকারপ্রধান।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে স্মরণ
পিতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সেই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিল। একই সঙ্গে শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথাও স্মরণ করছি। তাঁর সেই সফর আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করেছিল।’
সম্পাদনা: আবুল হোসেন