কালের কণ্ঠ : বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে আবাসন খাতের পরিস্থিতিকে কিভাবে দেখছেন?
ড. আলী আফজাল : বর্তমানে আবাসন খাত অত্যন্ত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পর্যন্ত সবকিছু মিলিয়ে বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।
কালের কণ্ঠ : প্রস্তাবিত বাজেটে নির্মাণসামগ্রী ও আবাসন খাতে কর ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রভাব কী হবে?
ড. আলী আফজাল : নতুন বাজেটে নির্মাণসামগ্রী ও আবাসন খাতে কর বৃদ্ধি অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নির্মাণ উপকরণের ওপর অতিরিক্ত কর, রেজিস্ট্রেশন খরচ বৃদ্ধি এবং জমির মালিকদের অংশে নতুন কর—সব মিলিয়ে খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে ফ্ল্যাটের দাম ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং নতুন বিনিয়োগও কমে যাবে।
কালের কণ্ঠ : রিহ্যাবের দীর্ঘদিনের দাবি—স্বল্পসুদে গৃহঋণ, কর রেয়াত ও নীতিগত সহায়তা, এবারের বাজেটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে?
ড. আলী আফজাল : দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, এবারের বাজেটে আমাদের মূল দাবিগুলো প্রতিফলিত হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ, রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানো এবং কর যৌক্তিকীকরণের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এবারের বাজেটে তার কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আবাসন খাতকে আরো চাপের মধ্যে ফেলেছে।
কালের কণ্ঠ : মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট-প্লট কেনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ‘সবার জন্য আবাসন’ নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ প্রয়োজন?
ড. আলী আফজাল : আবাসনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সিঙ্গেল ডিজিট সুদের হোম লোন, ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি ব্যবস্থা, রেজিস্ট্রেশন খরচ ৩ থেকে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা। মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ হাউজিং ফান্ড ও অপ্রদর্শিত অর্থকে বৈধ পথে আনার বাস্তবসম্মত নীতি। এ ছাড়া রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ আবাসন খাত ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কালের কণ্ঠ : ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে আবাসন খাতের সম্ভাবনা কতটা?
ড. আলী আফজাল : ঢাকার বাইরে আবাসন খাতের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শহরে এরই মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মেট্রো ও রেল সংযোগ, স্যাটেলাইট সিটি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক নীতি থাকলে ঢাকাকেন্দ্রিক জনসংখ্যার চাপ কমানো সম্ভব।
কালের কণ্ঠ : আবাসন খাতে অর্থপাচার, কালো টাকা, জমির উচ্চমূল্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে রিহ্যাব মনে করে?
ড. আলী আফজাল : এই খাতে স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য প্রয়োজন রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার সংস্কার। প্রকৃত বাজারমূল্যে লেনদেন নিশ্চিত করা, কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ, ডাবল ট্যাক্সেশন বন্ধ করা, অপ্রদর্শিত অর্থকে বৈধ চ্যানেলে আনার সহজ সুযোগ। বর্তমান কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থকে উৎসাহিত করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কালের কণ্ঠ : আবাসন খাত দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও রাজস্বের ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখে? বর্তমান সংকটের প্রভাব কী?
ড. আলী আফজাল : আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় খাত। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া সরকার প্রতিবছর রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট, ট্যাক্স ও অন্যান্য উৎস থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় এই খাত থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি সরাসরি ট্যাক্স আসে। কিন্তু বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে এই রাজস্ব আয় কমে যাবে এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে কর্মসংস্থানে, অনেক শ্রমিক ও মধ্যস্তরের পেশাজীবী কাজ হারাতে পারেন।
কালের কণ্ঠ : ভবিষ্যৎ আবাসন খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী হওয়া উচিত?
ড. আলী আফজাল : বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং ১০০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। এতে থাকতে হবে ২০৫০ ও ২১০০ সালের জনসংখ্যা বিবেচনা, হাইরাইজ নগরায়ণ, কৃষি, বন ও জলাভূমি জোনিং, সমন্বিত অবকাঠামো পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগের একীভূত মাস্টারপ্ল্যান এবং মেট্রো ও স্যাটেলাইট সিটিভিত্তিক নগর বিস্তার। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে আবাসন খাত আবারও দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাত হয়ে উঠতে পারে। সংকট থাকলেও সঠিক করনীতি, সহজ গৃহঋণ, নীতিগত সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে দেশের আবাসন খাত পুনরায় স্থিতিশীল ও প্রবৃদ্ধিমুখী হয়ে উঠবে।