নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যার দায়ে বিচারিক আদালত যাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের ২০টি মামলা নিয়ে বিচারে বসেছেন হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ। এসব মামলার ১৯টিই সাত বছর আগের।
নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যার দায়ে বিচারিক আদালত যাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের ২০টি মামলা নিয়ে বিচারে বসেছেন হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ। এসব মামলার ১৯টিই সাত বছর আগের।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে হাইকোর্ট বিভাগের যে কার্যতালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত এই বিশেষ বেঞ্চের আজকের (রবিবার) কার্যতালিকায় ২০টি ডেথ রেফারেন্স মামলার উল্লেখ আছে।
এসব ডেথ রেফারেন্সের মধ্যে চাঞ্চল্যকর মামলার ডেথ রেফারেন্সও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে গত বছরের ৬ মার্চ মাগুরায় চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া আছে আওয়ামী লীগ শাসনামলের ফেনীর সোনাগাজীতে এক মাদরাসাছাত্রীকে শ্লীলতাহানি ও পুড়িয়ে মারার মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলমসহ ১৬ জনকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতের এ রায়ের ছয় বছর পর হাইকোর্টে বিচারে উঠেছে এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল।
বিচারিক আদালত কোনো অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী সেই মৃত্যুদণ্ড কর্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। অনুমোদনের এই প্রক্রিয়াটিকে বলে ডেথ রেফারেন্স। রায় ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে রায়সহ মামলার যাবতীয় নথি হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠানো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দণ্ডিত আসামি বা আসামিদের আপিল। ডেথ রেফারেন্স ও আপিল ক্রমানুসারে সাজিয়ে বাঁধাই করা যে বই (ভলিউম) তৈরি করা হয়, সেটিকেই পেপারবুক বলে। হাইকোর্ট এই পেপারবুকের ভিত্তিতেই মামলা নিষ্পত্তি করে থাকেন।
যে প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ : গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে একটি ভবনের ফ্ল্যাটে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। অপরাধের এমন পৈশাচিকতা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে শিশুটির বাবার ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করায় ঘটনটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় গত ৭ জুন মামলার রায় দেন বিচারিক আদালত। রায়ে আসামি সোহেল রানা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। সেদিন এই মামলার রায়ের পর মামলার পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে জানতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের মুখোমুখি হন সুপ্রিম কোর্ট বিটের সাংবাদিকরা। এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিলম্ব বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় অ্যাটর্নি জেনারেলকে। এরপর তিনি দ্রুত ছুটে যান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে। সেখানে গিয়ে তিনি ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের বিলম্ব বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে এনে হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের দাবি জানান। সে সময় অ্যাটর্নি জেনারেলকে সমর্থন জানান আপিল বিভাগে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরাও। তখন প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ‘ডেথ রেফারেন্স ও আপিল’ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের ঘোষণা দেন।
পরে নিজ কার্যালয়ে ফিরে এ তথ্য ফের সাংবাদিকদের জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। গত ১০ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে এই বিশেষ দ্বৈত বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি।
বেঞ্চ গঠনের আদেশে বলা হয়, এই বেঞ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ কনফারমেশনের রেফারেন্স, আপিল, জেল আপিল এবং একই রায় থেকে উদ্ভূত আবেদন, রিভিশিন গ্রহণ ও শুনানি করবেন। আজ (রবিবার) থেকে এই বেঞ্চে বিচারকাজ শুরু হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০টি ডেথ রেফারেন্সের সঙ্গে আপিল যুক্ত করে কার্যতালিকা প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষ বেঞ্চ গঠন ইতিবাচক হলেও একে বৈষম্যমূলক বলছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে অপরাধগুলো দেশের মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে, এখানে (বিশেষ বেঞ্চে) হয়তো সেই সব চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হবে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু একই সঙ্গে তা বৈষম্যমূলক।’ হাইকোর্টে ২০১৭-১৮ সালের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘স্বাভাবিক গতিতে চললে আলোচিত মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে অন্তত ১০ বছর লেগে যাওয়ার কথা। বিশেষ বেঞ্চ হওয়ায় আলোচিত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে এই সময়টা লাগছে না; কিন্তু অন্য মামলাগুলোর ক্ষেত্রে তো ১০ থেকে ১২ বছর লাগবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ বেঞ্চ গঠনকে বৈষম্যমূলক মনে হবে। কারণ দ্রুত আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার তো সবারই সমান। যেসব ভুক্তভোগী পরিবার বছরের পর বছর আইনি লড়াই করছে, তাদের জন্য এটি (বিশেষ বেঞ্চ) অবশ্যই বৈষম্যমূলক। এ জন্য বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।’
বিশেষ টিম গঠন করেছে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ও : হত্যা, ধর্ষণ বা নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধগুলো শুধু একজন ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই যখন কোনো নারী বা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তখন রাষ্ট্র ধরে নেয় যে অপরাধী রাষ্ট্রের আইন ও নিরাপত্তাবলয় ভেঙেছে। এই কারণে রাষ্ট্র নিজেই ভুক্তভোগীর পক্ষে মামলার দায়িত্ব নেয়।
তা ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, যেকোনো গুরুতর বা আমলযোগ্য অপরাধের চূড়ান্ত তদন্ত ও বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যখন বিচারিক আদালত থেকে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে, তখন নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রকে প্রধান পক্ষ হতে হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে রাষ্ট্রের পক্ষে আইনি লড়াই করে থাকেন অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অন্য আইন কর্মকর্তারা (অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা)। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ‘ডেথ রেফারেন্স ও আপিল’ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পর স্পর্শকাতর এসব মামলার আইনি মোকাবেলা করতে অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই তাঁর নেতৃত্বে গঠন করেছেন একটি বিশেষ টিম। টিমের অন্যরা হলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওসমান চৌধুরী, মেহেদী হাসান, জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল দেওয়ান হুমায়ুন কবির রিপন।
এই টিম গঠনের পর গত ১১ জুন অ্যাটর্নি জেনারেল কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশেষ বেঞ্চের আলোচিত মামলাগুলোর শুনানিতে তিনি নিজেই অংশ নেবেন।
দ্রুত প্রস্তুত হচ্ছে পল্লবীর ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পেপারবুক : পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মামলাটির আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি করার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো মুলতবি চাওয়া হবে না।’ জানতে চাইলে বিশেষ টিমের সদস্য আইন কর্মকর্তা জামিউল হক ফয়সাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশেষ বেঞ্চের কার্যতালিকায় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলা এসেছে। তবে আমরা সব মামলার বিষয়েই প্রস্তুতি নিয়েছি। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে অ্যাটর্নি স্যার নিজেও এসব মামলার শুনানিতে অংশ নেবেন।’
পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পেপারবুক নিয়ে এই আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, পেপারবুক প্রস্তুতের কাজ দ্রুত হচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই এই মামলার পেপারবুক চলে আসবে বলে আশা করছি।’