মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

হালতি বিলের তীরে ‘সাত রাজকন্যার গ্রাম’

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার বিখ্যাত হালতি বিলের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত খাজুরা লাহিড়ীপাড়া। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই জনপদ একসময় ছিল জমিদারি ঐশ্বর্য, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের কাছে ‘সাত রাজকন্যার গ্রাম’ নামে পরিচিত এই গ্রাম আজও বহন করে শত বছরের ইতিহাসের স্মৃতি। তবে, যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের শেষ চিহ্নগুলো।

 

এলাকাবাসী জানান, একসময় খাজুরা লাহিড়ীপাড়ায় লাহিড়ী জমিদারদের ৩৪টি জমিদার বাড়ি ছিল। বিশাল অট্টালিকা, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, মন্দির, দীঘি ও নানা অবকাঠামো নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে জমিদার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে কেবল কয়েকটি ভগ্নপ্রায় স্থাপনা, পুরনো বসতভিটা এবং একটি জরাজীর্ণ শিব মন্দির অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঈদে কক্সবাজারের যেসব জায়গায় ঘুরতে যেতে পারেন

এলাকাবাসী জানান, এই গ্রামে ২২ জমিদারের বাস ছিল। অর্ধ বঙ্গেশ্বরী নাটোরের রানী ভবানীর কন্যাসহ ৭ রাজকন্যার বিয়ে হয় এই গ্রামের ৬ জমিদার পুত্রের সঙ্গে। জমিদার পুত্ররা হলেন- শামাকান্ত লাহিড়ী, উম্মেকা কান্ত লাহিড়ী, সুরেন্দ্র নাথ লাহিড়ী, রঘুনন্দন লাহিড়ী, সুরেন্দ্র মোহন লাহিড়ী ও জীতেন্দ্র নাথ লাহিড়ী। স্থানীয়রা জানান, নাটোরের রানী ভবানীর একমাত্র মেয়ে তারা সুন্দরীর বিয়ে হয় এই গ্রামের জমিদার রঘুনন্দন লাহিড়ীর সঙ্গে। জমিদার শামাকান্ত লাহিড়ী বিয়ে করেন দুই রাজকন্যাকে। প্রথম স্ত্রীর কথা কেউ বলতে না পারলেও দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছার জমিদার কন্যা ইন্দুবালা।

 

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় এই অঞ্চলে লাহিড়ী জমিদারদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তাদের দান-অনুদান, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের নানা কাহিনী এখনো  লোকমুখে প্রচলিত। গ্রামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাত রাজকন্যার কিংবদন্তিও, যা খাজুরাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

বর্তমানে ধ্বংসপ্রায় স্থাপনাগুলো দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকরা আসেন। বর্ষা মৌসুমে হালতি বিলের মনোমুগ্ধকর জলরাশি এবং জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য দৃশ্য। কিন্তু, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা পল্লী চিকিৎসক মো. আল আমিন বলেন, “ছোটবেলা থেকে পূর্বপুরুষদের কাছে লাহিড়ী জমিদারদের নানা গল্প শুনে বড় হয়েছি। একসময় এখানে ৩৪টি জমিদার বাড়ি ছিল। এখন তার অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হলে এটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।”

খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসেন বলেন, “খাজুরা গ্রাম আমাদের ইউনিয়নের গর্ব। ‘সাত রাজকন্যার গ্রাম’ হিসেবে এর ঐতিহাসিক পরিচিতি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে আমরা পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটকদের সুবিধার বিষয়টি দেখভাল করছি। তবে, স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগ প্রয়োজন।”

 

নলডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশিকুর রহমান বলেন, “ঐতিহাসিক এ স্থানের জমিজমা ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন কোনো সম্পত্তি যাতে অবৈধভাবে দখল না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।”

নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল এমরান খাঁন বলেন, “হালতি বিলের পাশেই খাজুরা লাহিড়ীপাড়ার অবস্থান হওয়ায় এর পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে, যাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।”

 

নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “নাটোর ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা। খাজুরার লাহিড়ী জমিদার বাড়ির বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। এর ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ এবং পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করে খাজুরা লাহিড়ীপাড়াকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হোক। তাদের মতে, হালতি বিলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত করা গেলে নাটোরের পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

 

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খাজুরা লাহিড়ীপাড়ার ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ি ও শিব মন্দির যেন আজও অতীতের গৌরবগাথা

সম্পর্কিত বিষয়:

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com