মুসলিম ঐতিহ্য, স্থাপত্য কৌশল, বিজয় স্মারক এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক বহুবিধ উজ্জ্বলতায় মসজিদের ভূমিকা অনন্য। মসজিদের হক ও মসজিদ আবাদের শর্ত প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রথম দিন থেকেই মসজিদের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে তাকওয়ার (ধর্মভীরুতা) ওপর…।’
(সুরা : তাওবা আয়াত : ১০৮)
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মসজিদ ইন্দোনেশিয়ায়। ভারত দ্বিতীয়।
মুসলমানের সমাজ মসজিদভিত্তিক সমাজ। এ সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য :
ইবাদতমূলক কার্যক্রম,
সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম।
মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার যোগাযোগ, তাঁর কাছে চাওয়া-পাওয়ার মাধ্যম হলো মসজিদকেন্দ্রিক ইবাদত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(সত্যিকার অর্থে) মসজিদগুলো আবাদ রাখা তাদের কাজ, যারা আল্লাহর ওপর ও কিয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখে, নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় করে…।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
ইবাদতের প্রেরণায় মানবিক কল্যাণকামিতা মসজিদভিত্তিক সমাজের অন্যতম সুফল। ‘নামাজ পড়লেই মানুষ ভালো হয় না।’—এজাতীয় ধারণা ঈমানি মূল্যবোধ পরিপন্থী।
প্রিয় নবী (সা.)-এর উচ্চারণ—‘কল্যাণকামিতাই ধর্ম।’ (মুসলিম)
হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি প্রিয় নবী (সা.) বরাবর অভিযোগ করে, ‘অমুকে রাতে নামাজ পড়ে, ভোরে চুরি করে।’ তিনি (সা.) বলেন, ‘তুমি যা বলেছ নামাজ তাকে সেটা থেকে (চুরি করা) বিরত রাখবে।’ (তাহকিক মিশকাত ও অন্যান্য)
সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে মসজিদের ভূমিকা অনন্য। আইন দ্বারা যা বাধ্য করা যায় না, শাস্তি দিয়ে যা নির্মূল হয় না, মসজিদ তা করে দেখায়। আত্মসংশোধন ও কল্যাণকামী সমাজ বিনির্মাণে মসজিদ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদারের দুনিয়ার কোনো মুসিবত দূর করে দেবে, আল্লাহ বিচার দিবসে তার মুসিবত সরিয়ে দেবেন। যে কোনো দুঃস্থের অভাব দূর করবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতা করে আল্লাহও ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন।…যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোনো একটি গৃহে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সঙ্গে মিলে (কোরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা বর্ষিত হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতারা তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাদের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে ব্যক্তির কর্ম তাকে পিছিয়ে দেবে তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দেবে না।’
(মিশকাতুল মাসাবিহ, কিতাবুল ইলম)
জনকল্যাণে মসজিদভিত্তিক সমাজের করণীয় উদ্যোগ হতে পারে :
সামাজিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান।
ইমাম, বয়োজ্যেষ্ঠ স্থায়ী মুসল্লি, হাজি সাহেবান, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ে ‘জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ কমিটি’ গঠন।
ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী, আবাসন, আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগে সহায়তা করা।
মসজিদ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় গবেষণা পরিচালনা করা।
মসজিদ স্থাপত্যশৈলী ও প্রত্নসম্পদ সুরক্ষা।
সুদমুক্ত, জাকাতভিত্তিক সমবায় কার্যক্রম পরিচালনা করা।
মসজিদের রাস্তার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া।
সাম্য ও সম্প্রীতি গড়ে তোলা।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।
মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং প্রসূতিকল্যাণ।
নারীকল্যাণ।
ত্রাণ ও দুর্যোগব্যবস্থাপনা।
অপরাধ দমন।
ধর্মের নামে অশিক্ষা, অপশিক্ষা, অর্ধশিক্ষা ও কুসংস্কার প্রতিহত করা।
ধর্মীয় বিষয়ে আধুনিক ব্যাখ্যা ও তথ্য সম্পর্কে জনগণকে অবহিতকরণ।
শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলাম প্রচার।
সৎ, সুশিক্ষিত ও ধর্মপ্রাণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা।
বস্তুত উম্মতে মুহাম্মদির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ এবং বিশ্বব্যাপী ইসলাম বিস্তরণের সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র মসজিদ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে…।’ (সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ১১০)
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর