দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানিসংকটের মধ্যে প্রথমবারের মতো অতিগভীর কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় প্রত্যাশা। কারণ সফল হলে মিলতে পারে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস, যা দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জানা গেছে, এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে প্রায় দুই বছর দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভীর কূপ খনন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর। প্রত্যাশা পূরণ হলে এটি শুধু জ্বালানিসংকটই কমাবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও নতুন গতি যোগ করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে সাধারণত দুই হাজার ৭০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ মিটার গভীরতায় গ্যাস পাওয়া গেলেও তিতাস ৩১ নম্বর কূপ খনন করা হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) অতীতের রেকর্ড ভেঙে এবার পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার নিচে গত ১৯ এপ্রিল শুরু করেছে কূপ খননের কাজ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সাধারণত মাটির অতল গভীরে গ্যাসের বড় মজুদের সম্ভাবনা থাকে। সেই রুদ্ধ দুয়ার খুলতেই পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার বা ৫.৬ কিলোমিটার নিচ পর্যন্ত ড্রিল করা হবে। এটিকে ডিপ ড্রিলিং বলা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় কম্পানির প্রযুক্তিগত সহায়তায় কাজ করছেন দেশীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
নির্ধারিত সময় ২১০ দিন, এরই মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেছেন, এই কূপ খনন শেষে একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদেও আরেকটি কূপ খনন করা হবে। যার গভীরতা হবে চার হাজার ৩০০ মিটার। এতে মোট ব্যয় হবে ৫৯৪ কোটি টাকা। সবকিছু ঠিক থাকলে কূপ দুটিতে দুই টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে খনন শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই জানা যাবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে, আর কতটুকুই বা উত্তোলন করা যাবে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস অঞ্চলে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া একই প্রকল্পের আওতায় বাখরাবাদ ১১, শ্রীকাইল ও মোবারকপুরেও গভীর কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য মজুদ দেড় থেকে দুই টিসিএফের কাছাকাছি হতে পারে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, ‘আমরা গ্যাসসংকট কাটাতে এরই মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এর মধ্যে ২৫টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কাজ শেষ হয়েছে। সেসব কূপ থেকে সম্ভাব্য প্রতিদিন ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে এবং বর্তমানে প্রতিদিন ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভোলায় আরো পাঁচটি নতুন কূপ খননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অতিগভীর কূপ খনন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এসব কূপে যে সম্ভাবনা আমরা দেখছি, তাতে গ্যাস নিশ্চিত হলে দেশের জ্বালানি সংকট অনেকটা কেটে যাবে।’
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে সরবরাহ মাত্র দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় কূপগুলো থেকে আসছে প্রায় এক হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকিটা পূরণ করতে হচ্ছে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।