সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সিরাজদিখানের প্রসিদ্ধ পাতক্ষীর

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার অনন্য ঐতিহ্যের নাম পাতক্ষীর। গত বছর এই সুস্বাদু মিষ্টান্নটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। কলাপাতায় মোড়ানো এই খাবারটি শুধু রসনার তৃপ্তিই মেটায় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস ও বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি। এই স্বীকৃতি পাতক্ষীরকে কেবল একটি স্থানীয় খাবার থেকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করেছে।

 

পাতক্ষীরের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং আভিজাত্যে ভরপুর। ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল আমলেও ঢাকাবাসীর খাদ্যতালিকায় পাতক্ষীরের নাম পাওয়া যায়। তবে লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপাড়া গ্রামে প্রায় দুই শতক আগে এই পাতক্ষীরের উৎপত্তি।

পুলিনবিহারী দেব ও তাঁর স্ত্রী সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে এই মিষ্টান্ন তৈরি শুরু করেন।

পরে এই গ্রামের ঘোষ পরিবারের সদস্যরা পাতক্ষীর তৈরির কৌশল শিখে নেন এবং বংশপরম্পরায় তা টিকিয়ে রাখেন। 

খুবই চমকপ্রদ একটি বিষয় হলো, পাতক্ষীর তৈরির গোপন কৌশলটি পরিবারের মেয়েদের পরিবর্তে কেবল পুত্রবধূদের শেখানো হয়, যাতে এই শিল্পের গোপনীয়তা অন্য কোথাও চলে না যায়।

সিরাজদিখান এবং এর আশপাশের এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পাতক্ষীর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত শনিবার সিরাজদিখান বাজারে গিয়ে দেখি মিষ্টির দোকানগুলোতে কলাপাতায় সাজানো পাতক্ষীর।

এই মিষ্টান্নটি স্থানীয় অর্থনীতিতে দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দুধের অসাধারণ এক মূল্য সংযোজন ঘটাচ্ছে এই শিল্প। 

পাতক্ষীর তৈরির প্রধান উপকরণ হলো গরুর খাঁটি দুধ, সামান্য চিনি এবং এক চিমটি হলুদ। সিরাজদিখানের বাজারগুলোতে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ দুধ বেচাকেনা হয়, যার একটি বিশাল অংশ সরাসরি পাতক্ষীর কারিগররা কিনে নেন। সাধারণত ৩০ লিটার দুধ জ্বাল দিয়ে মাত্র পাঁচ কেজি পাতক্ষীর তৈরি করা হয়।

পাতক্ষীরসহ মিষ্টান্ন তৈরির ফলে স্থানীয় খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পাতা পাতক্ষীর বিক্রি হলেও শীতকালে পিঠা উৎসবের মৌসুমে এই চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তখন কারিগর ও বিক্রেতাদের ব্যস্ততাও বেড়ে যায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি চাঙ্গা ভাব নিয়ে আসে। 

সিরাজদিখানের দুধবাজারে খামারিদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, এই এলাকায় মিষ্টান্ন তৈরি হয় বলেই সব সময় দুধের চাহিদা থাকে। কৃষক পরিবারগুলো একটা-দুইটা করে গাভি লালন-পালন করে সংসারে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করতে পারছে।

সিরাজদিখান বাজারে অনেক মিষ্টির দোকান। সবচেয়ে পুরনো মিষ্টান্নের দোকানটিতে গিয়ে কথা হয় নারায়ণ চন্দ্র চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে। তিনিই এখন পাতক্ষীরের সবচেয়ে বয়স্ক কারিগর। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাপ-দাদার কাছ থেকেই শিখেছিলাম। তার আগেও তৈরি হতো এই ক্ষীর। দেশের নানা প্রান্ত থেকে বহুলোক এসে এই পাতক্ষীরের স্বাদ নিয়ে যায়।’

নারায়ণ চন্দ্র ঘোষের বয়স আশির ঊর্ধ্বে। এখন ব্যবসার হাল ধরেছেন ছেলে সুশান্ত ঘোষ। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন পাতক্ষীর বানানোর কারখানায়, সন্তোষপাড়া গ্রামে। গ্রামের ঘরে ঘরে পাতক্ষীর তৈরির কারখানা। চলছে এই মিষ্টান্ন তৈরির কাজ। পাতক্ষীরের মূল উপকরণ দুধ আর চিনি। দুধকে দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। আর তাতে মেশানো হয় অল্প পরিমাণে চিনি। রঙের জন্য লাগে সামান্য হলুদ। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর পাতক্ষীরকে এখন বিশ্ব-পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেওয়ার বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় করতে হলে সর্বাগ্রে এর মোড়ক বা প্যাকেজিং ব্যবস্থায় আধুনিকতা আনতে হবে। কলাপাতায় মোড়ানোর যে চিরায়ত পদ্ধতি, তার পাশাপাশি এটিকে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য বিজ্ঞানসম্মত উপায় অবলম্বন করা জরুরি। গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে কোল্ড চেইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

প্রবাসী বাঙালিদের কাছে পাতক্ষীরের একটি তীব্র নস্টালজিক আবেদন রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন সুপারশপে এটি বাজারজাত করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এর পরিচিতি বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি ডিজিটাল মার্কেটিং এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খাদ্য মেলায় পাতক্ষীরকে তুলে ধরার মাধ্যমে বিদেশি ভোজনরসিকদেরও এর স্বাদের প্রতি আকৃষ্ট করা যেতে পারে।

পাতক্ষীরকে আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় করে তোলা কেবল বাণিজ্যিক কারণেই নয়; বরং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজন। একটি জিআই পণ্য হিসেবে এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি শক্ত ভিত্তি। এটিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারলে কারিগররা তাঁদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পাবেন এবং নতুন প্রজন্ম এই প্রাচীন পেশায় যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। তাই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পাতক্ষীরকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করবে এবং আমাদের খাদ্যাভ্যাসের গৌরবময় ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com