২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি বা আইএইচআর ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায়, দেশে হাম রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বৃদ্ধি হয়েছে দেশের ভেতরে চলমান সংক্রমণের কারণে। জানুয়ারি থেকেই বাংলাদেশে হাম রোগীর সংখ্যা স্পষ্টভাবে বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন মূল্যায়নের পর সংস্থাটির সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জানুয়ারি থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে এবং তা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় হামকে জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করা এবং দ্রুত টিকাদান জোরদার করা প্রয়োজন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহজনক হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ৮৯৭ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৬৬ জন, যার মধ্যে নিশ্চিত মৃত্যু ৩০টি। মৃত্যু হার ১.১ শতাংশ। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন রোগী, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে প্রায় ৯ হাজার ৭৭২ জন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে চিকিৎসা নিয়েছে এক হাজার ২১৫ জন। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭২ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৬০ জন।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ২৯ হাজার ৫৪৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগীর তথ্য পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৯৮ জনের। পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত করা গেছে চার হাজার ২৩১ জনের। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের।
কোথায় বেশি সংক্রমণ : সবচেয়ে বেশি হামের রোগী পাওয়া যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে। এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় রোগীর হার বেশি। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীর চর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সন্দেহভাজন মৃত্যুর বেশির ভাগই টিকা না পাওয়া ছোট শিশুদের মধ্যে। আক্রান্তদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ৭৯ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী। এ ছাড়া দুই বছরের নিচে শিশুর হার ৬৬ শতাংশ। ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ।
রোগের প্রকৃতি ও ঝুঁকি : হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত একটি রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের সাত থেকে ১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং মুখে সাদা দাগ দেখা দেয়। পরে শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে। রোগটি সাধারণত মৃদু হলেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিস, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। অপুষ্ট শিশু, ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে ভোগা শিশু এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
দেশের এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইতিমধ্যে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। এমনকি ছয় থেকে সাত মাস বয়সীদেরও টিকার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ। হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো, নজরদারি জোরদার, রোগী শনাক্ত ও রিপোর্টিং উন্নত করা এসব কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দিয়েছে, টিকার দুই ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত রোগ শনাক্ত ও নজরদারি জোরদার করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নজর দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা দিতে হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।