গত মাসের শেষে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ বেতন কাঠামো ও ক্রীড়া ভাতার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ক্রীড়া ভাতা আর্থিক অনুদান নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সরকার জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং তাদের একাগ্রতা বজায় রাখার জন্য একটি স্থায়ী বেতন কাঠামো তৈরি করেছে। এই ভাতার মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের হয়ে আরও ভালো ফল অর্জনে ক্রীড়াবিদদের উৎসাহিত করা। যখন একজন খেলোয়াড় জানেন, মাস শেষে তাঁর কাছে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন আসবে তখন তিনি মাঠের বাইরে জীবন-জীবিকার চিন্তায় মগ্ন না হয়ে মাঠের ভেতরে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এটি মূলত পেশাদারিত্বের একটি শক্তিশালী ভিত্তি।
এই বেতন কাঠামোর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ব্যবস্থা। সুবিধাটি পাওয়ার পর যেন অ্যাথলেটদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব তৈরি না হয়, সে জন্য চার মাস পরপর তাদের পারফরম্যান্স কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হবে। যদি কোনো খেলোয়াড় তাঁর খেলার মান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, তবেই এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু পারফরম্যান্সে ঘাটতি দেখা দিলে তাঁকে তালিকা থেকে বাদ পড়তে হবে এবং নতুন প্রতিভা সেখানে জায়গা করে নেবে। নিয়মটি ক্রীড়াঙ্গনে একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে, যেখানে সবাই নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম করতে বাধ্য হবে।
ক্রীড়া কার্ডের সুবিধাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল টাকার কার্ড নয়। এ কার্ডধারীরা আন্তর্জাতিক মানের উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি তাদের জন্য থাকবে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, যা একজন অ্যাথলেটের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে অত্যন্ত জরুরি। বিদেশি কোচের অধীনে প্রস্তুতি নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, এখন থেকে সরকার সরাসরি সেই অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। এমনকি খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা যেন অথৈ জলে না পড়ে, সে জন্য পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।
মাঠের লড়াইয়ে ঘাম ঝরানো খেলোয়াড়দের কণ্ঠেও আজ স্বস্তির সুর। টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা বা জাভেদ আহমেদের মতো অ্যাথলেট, যারা বছরের পর বছর পিছুটান নিয়ে খেলেছেন, তারা এখন খেলাকেই পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন। দেশের সাবেক দ্রুততম মানব মোহাম্মদ ইসমাইল যেমন বলছিলেন, একজন অ্যাথলেটের নিজের ফিটনেস ঠিক রাখা আর পুষ্টির চাহিদা মেটাতেই মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন সেই টাকা আর দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। আরচার হিমু বাছাড় কিংবা নারী ফুটবলের কাণ্ডারি সাবিনা খাতুনের মতে, এখন অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের খেলাধুলায় পাঠাতে আর দ্বিধা করবেন না। কারণ পেশা হিসেবে এর ভবিষ্যৎ এখন সুনিশ্চিত। বিশেষ করে প্যারা অ্যাথলেট শহীদ উল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়– এ উদ্যোগ কতটা মানবিক।
প্রথম ধাপে আর্চারি, বক্সিং, জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার, ভারোত্তোলন, উশু, প্যারা অ্যাথলেটিকস, কারাতে, সেপাক তাকরো, টেবিল টেনিস, কাবাডি, ভলিবল, বাস্কেটবল, ব্রিজ ও ফুটসালের ক্রীড়াবিদরা এই সুবিধার আলোয় আসছেন। এটি কেবল শুরু। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খেলাকেও এই কাঠামোর অধীনে আনা হবে। যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একজন খেলোয়াড়কে এভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তখন তা কেবল সেই ব্যক্তির জন্য নয়, বরং গোটা ক্রীড়া পরিবারের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারের পদক্ষেপের মাধ্যমে সোনালি আগামীর যে স্বপ্ন আজ বুনে দেওয়া হলো, তার ফলস্বরূপ অদূর ভবিষ্যতে অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হবে– এটিই আজ দেশবাসীর প্রত্যাশা।
মো. নূর আলম: তথ্য অফিসার; জনসংযোগ কর্মকর্তা, যুব
ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়