বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। তিনি কভিড-১৯ অতিমারির সময়ে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৪ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করে তৎকালীন পাকিস্তান ভ্যাক্সিন ল্যাবরেটরির গবেষণা বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। পরে যুক্তরাজ্যের হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন এবং ১৯৭৭ সালে দেশে ফিরে মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টে ভাইরোলজির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম।
সমকাল: অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের কাছে সফল উদাহরণ। সেই ব্যবস্থা ভাঙল কীভাবে?
নজরুল ইসলাম: বিভিন্ন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই খুব শক্তিশালী ছিল বাংলাদেশে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির অংশ এই ব্যবস্থা ভেঙেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে কর্মসূচি অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) আওতায় টিকা কেনা হতো, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্টে তাতে ছেদ পড়ে। ফলে টিকা কার্যক্রম সংকটে পড়ে। এতে গ্রাম পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়েছে; ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ছেদ পড়েছে। এই সময়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিসহ অনেক কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে, যার অন্যতম প্রাদুর্ভাব হামের সংক্রমণ। শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে; আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
সমকাল: কোনো চলমান জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি এভাবে হঠাৎ বন্ধ বা পরিবর্তন করা যায়? কেন এই পরিবর্তন আনতে হয়েছিল?
নজরুল ইসলাম: এভাবে হঠাৎ পরিবর্তন বা বন্ধ করা যায় না। পরিবর্তন আনতে হলে তা একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে করতে হবে। কেন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছিল– কর্তৃপক্ষই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে। যতটা জানি, পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নতুন দলিল তৈরি এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাতিল করা হয়েছিল। ইউনিসেফ থেকে টেন্ডার পদ্ধতিতে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্তে সমন্বয়হীনতায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। আগের ওপি বাতিল করার সময় কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা বা নতুন প্রকল্প-দলিল প্রস্তুত না থাকায় টিকা কেনা ও অর্থ ছাড়ে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে যাওয়ার চেষ্টার সময় অর্থ মন্ত্রণালয় আপত্তি জানায়। যার ফলে টিকা কেনার ফাইল অনুমোদনে দেরি হয়।
সমকাল: ইপিআই কর্মসূচিতে অব্যবস্থাপনার ফলে কোনো সংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির ঘটনা আগে কখনও ঘটেছে?
নজরুল ইসলাম: দেশে ইপিআই কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১৯৭৮ সাল থেকে। এরপর অনেক কারণেই বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা ছিল। কিন্তু ২০২৪ পর্যন্ত ইপিআই কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতার জন্য কখনও সেটা ঘটেনি। এ দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ইপিআই কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি। ইপিআই কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার কারণেই এ কর্মসূচির কাঠামো সুফল দিয়েছে। এর ফলে মানুষের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এমনকি করোনা অতিমারির সময়ে ইপিআই কার্যক্রম বরং বেশ জোরালো হয়েছে। মানুষও তখন সচেতন হয়েছে। প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছে। ফলে টিকা দেওয়ার হার আরও বেড়েছে। অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ সেবা কাঠামো ব্যবস্থায় ছেদ পড়ল।
সমকাল: টিকা ফুরিয়ে যাবে– এ তথ্য কি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবহিত ছিল না?
নজরুল ইসলাম: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছেন। কোনো স্টোরেই টিকা ছিল না। এমনকি হামের প্রাদুর্ভাবের পরও তাদের কাছ থেকে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য সরকারি চাকরিতে আবার শাস্তির ব্যাপার আছে। স্বাস্থ্য খাতকে জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিটি করা হয়েছিল। অনেক সুপারিশও দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে। তবে সেখানে ইফেকটিভ কিছু হয়নি বলে আমার ধারণা।
সমকাল: এবার হামের প্রাদুর্ভাব থেকে ভবিষ্যতে যক্ষ্মা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া বা এইচআইভির মতো রোগের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা?
নজরুল ইসলাম: হামের মতো রোগের প্রকোপ মানেই অন্যান্য সংক্রমণজনিত রোগ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দেখুন, সংক্রমণজনিত রোগের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি প্রয়োজন। ঢাকা শহরে সাড়ে তিন কোটির বেশি মানুষের বাস। অথচ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল মাত্র একটি। সেখানে শয্যাও খুব অল্প। অথচ এখানে মানুষের স্পর্শ এড়িয়ে জীবন ধারণের কোনো সুযোগ নেই। ঢাকায় আরও চার-পাঁচটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল প্রয়োজন। এই প্রকোপের সময় আক্রান্ত শিশুরা তাহলে সেবা পেত। প্রাণহানির সংখ্যা কমে আসত। আপাতত কয়েকটি হাসপাতালে সংক্রামক ব্যাধির জন্য শয্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না। এর সঙ্গে অক্সিজেন ব্যবস্থা থেকে আইসিইউ ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। অন্যান্য সংক্রামক রোগ বাড়লে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
সমকাল: হামে আক্রান্ত শিশুর ৮০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম, যাদের এখনও টিকা নেওয়ার সময় হয়নি।
নজরুল ইসলাম: শিশু জন্মের সময় মায়ের কাছ থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। সাধারণত মনে করা হয়, সেই ক্ষমতা থাকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত। এ জন্য এতদিন ভ্যাকসিনগুলো ৯ মাস বয়স থেকে দেওয়া হতো। কিন্তু শিশুদের জন্মগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসছে। এ জন্য এখন সরকার ছয় মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলছে। আমি মনে করি, শিশুদের জন্মগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সুরক্ষায় অন্তঃসত্ত্বা মাকেই এই ভ্যাকসিনগুলো দিতে হবে। শুধু হাম না; সব ভ্যাকসিন দেওয়ার কথাই এভাবে ভাবতে হবে। এখন শিশুরা ছয় মাসের আগেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ইপিআই রিঅ্যাকটিভেট করতে হবে।
সমকাল: অভিভাবকরা এখন সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। একজন থেকে সাধারণত কয়জন পর্যন্ত ছড়াতে পারে হাম?
নজরুল ইসলাম: অভিভাবকদের ভয় অমূলক নয়। হাম ছোঁয়াচে রোগ এবং দেখা যাচ্ছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া হয়ে এত দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটছে যে, সময়ই পাওয়া যাচ্ছে না চিকিৎসার। টিকার অব্যবস্থাপনায় একেবারে ছোট্ট শিশুরা বেশি আক্রান্ত হলেও স্কুলগামী শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। অনেক শিশুই অপুষ্টিতে ভোগে। আর একজন থেকে কতজনের মধ্যে হাম সংক্রমিত হতে পারে, সেটা নির্ভর করে সে কতজনের সঙ্গে মেলামেশা করছে। তবে জনসংখ্যার ঘনত্বসহ নানা বিষয় বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, এ দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজনের হাম ১৫ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
সমকাল: আগামী রোববার থেকে সারাদেশে দুই কোটির বেশি টিকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে এখনও সিরিঞ্জ নেই। এত দ্রুত সম্ভব হবে কার্যক্রম চালানো?
নজরুল ইসলাম: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এরই মধ্যে টিকা কেনা হয়েছে। এই দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণকে সাধুবাদ জানাই। তবে সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত জেলাসহ সব এলাকায় টিকা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের সংস্থা ও বিভাগগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আপনার মনে আছে কিনা, ২০২৫ সালে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। তখন টিকা কেনার প্রস্তাবনার অনুমোদন দিতে দেরি হয়েছিল অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হওয়ায়। এখন এই প্রাদুর্ভাব যখন তৈরি হয়েছে, তখন দেশজুড়ে টিকা কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। হাসপাতালগুলোকেও ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে।
সমকাল: হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার চিত্র কেমন?
নজরুল ইসলাম: সরকারি হাসপাতালে দেওয়া এক্স-রে মেশিন, সিটি স্ক্যান যন্ত্র প্রায়ই শুনবেন– নষ্ট। সেখানে গিয়ে রোগীরা ফিরে আসেন। অথচ সরকারি হাসপাতালের ১০ হাত দূরে অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতালের মেশিনটি ঠিকই কাজ করে। বিকেলে গেলে দেখবেন সরকারি হাসাপাতালের চিকিৎসক সেই বেসরকারি হাসাপাতালে বসে রোগী দেখছেন। আর সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে গেছে দালাল। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারি এবং শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সবকিছু জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারলে শুধু টিকা কর্মসূচি নয়, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতেরই উন্নতি হবে।
সমকাল: সংক্রামক ব্যাধি নিরাময়ে সাধারণ মানুষের জন্য এখন কোন ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন?
নজরুল ইসলাম: সাধারণ মানুষকে ভ্যাকসিন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। টিকা নিতে হবে। হামের সংক্রমণ এড়ানো ছাড়াও মাস্ক পরা সবসময়ই জরুরি। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। অপ্রয়োজনে ভিড়ে যাওয়া যাবে না। করোনা অতিমারির সময়ে যে নিয়মগুলো ছিল, ঠিক তেমন। জনসমাগম থেকেই রোগ ছড়ায় সবচেয়ে বেশি। আর শিশু বা বয়স্ক মানুষ যে-ই হোক, উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে নিতে হবে।
সমকাল: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নজরুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভেচ্ছা।