মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন ও পৃথক বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলোপে যখন সংসদে বিল উত্থাপন করেছে ক্ষমতাসীন দল, সেই সময়ে তিন মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারকে নির্দেশ দিলেন হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়ে ১৯৭৫ সালে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে ২০১৭ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য প্রণীত শৃঙ্খলাবিধিও অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
গত বছর ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর  হাইকোর্ট বেঞ্চ। গতকাল সেটিরই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

এর মধ্যে বিচারকদের সংগঠনগুলো গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। অধ্যাদেশ বাতিলকে বিচার বিভাগের পৃথককরণ ও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার পথে বাধা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এসব বিবৃতিতে।

যে অধ্যাদেশে সচিবালয় গঠিত হয়েছে, তা বাতিলের সিদ্ধান্তে অনেক বিচারক তাদের প্রতিক্রিয়া সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন। এ কারণে গতকাল আইন মন্ত্রণালয় অধস্তন আদালতের ২৮ বিচারককে শোকজ করেছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, জুলাই জাতীয় সনদে পৃথক বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে বিএনপিসহ সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল। বিএনপির ৩১ দফার প্রতিশ্রুতিতেও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। তবে বিএনপি এখন বলছে, অধ্যাদেশ বাতিল হলেও পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা হবে।

পৃথক সচিবালয় বিলোপের পথে
হাইকোর্টের সংক্ষিপ্ত রায়ের পর গত ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ৪(২) ধারায় প্রধান বিচারপতিকে সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিচার বিভাগীয় সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সংক্রান্ত কাজে রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে।
এর মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বিচারকদের চাকরি।

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ তথা বদলি, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করবেন। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ছিল। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়।

দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালুর পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নামে রাষ্ট্রপতির হলেও আদতে তা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে চলে যায়। আইন মন্ত্রণালয় বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ জারির ফলে এই ক্ষমতা আবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাছে যায়। সে অনুযায়ী গত ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। তবে বিএনপি সরকার সচিবালয় বিলুপ্তির জন্য অধ্যাদেশকে রহিত করে হেফাজতে নিতে গত সোমবার সংসদে বিল উত্থাপন করেছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। বিলটি পাস হলে আগামী ১১ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলোপ হবে। সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিল পাস নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই।

রায়ে কে কী বলছেন
পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট রিট করেন ১০ আইনজীবী। মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সমকালকে বলেন, আদালত নিজেই বলেছেন– সাংবিধানিক প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা জড়িত। তাই ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্টিফিকেট দিয়েছেন। কাজেই রায়টি পর্যালোচনার পর আপিল বিভাগে সরাসরি আপিল করা হবে। আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রায় কার্যকরের সুযোগ আছে বলে মনে করি না। সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত নির্মোহভাবে আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি করবেন বলে প্রত্যাশা করি।

রায়ের পর রিটকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, হাইকোর্ট সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, এখন থেকে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সুপ্রিম কোর্টের ওপরে; রাষ্ট্রপতি, সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের ওপরে নয়। এর অর্থ হচ্ছে– বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, ছুটি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন সুপ্রিম কোর্ট। এই কাজ করার জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার।
সংসদে সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিতের জন্য বিল উত্থাপিত হওয়ায় রায়টি বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা– এমন প্রশ্নে শিশির মনির বলেন, আদালত সংসদকে নয়; সরকারকে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবে। সরকার বাহাত্তরের সংবিধান মেনে চলার কথা বলছে বারবার। বাহাত্তরের সংবিধানেই সুপ্রিম কোর্টকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পঁচাত্তরের সংশোধনীকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছেন। ফলে বাহাত্তরের বিধান ফিরেছে।

রায়ের বিষয়ে শিশির মনির বলেন, তিন মাসের মধ্যে পরিপূর্ণ সচিবালয় কাজ করতে হবে। পৃথক এই বিচার বিভাগীয় সচিবালয় থাকা এটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য।
এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে মতামত দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। রায়ের কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় সংসদ বাতিল

করতে পারে না। কাজেই রায়ের কার্যকারিতা থাকবে। আবার সংসদেরও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে আইন প্রণয়ন করতে হয়।
এ আইনজীবী আরও বলেন, এখন যদি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলোপ হয়, সেটি রায়ের পরিপন্থি হবে, আদালত অবমাননা হবে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে যা বলা হয়েছে
রায়ে আদালত বলেন, মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছিল বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বিনষ্ট হবে। কিন্তু হাইকোর্ট মনে করে এই যুক্তি সঠিক নয়। কারণ সংবিধানে বলা আছে, বিচার বিভাগ প্রভাবমুক্ত থাকবে। তাছাড়া রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভ; আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার যে পৃথককরণ নীতি, বিদ্যমান ১১৬ অনুচ্ছেদ সেই নীতিকে খর্ব করেছে। কারণ রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের একটি আরেকটির ওপর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না।

রায়ে বলা হয়েছে, সে কারণে আদালত মনে করেন, বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক। এ জন্য তা বাতিল ঘোষণা করা হলো। একই সঙ্গে আদি  সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলে সেটি হবে ক্ষমতা পৃথককরণ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন।

আদালত আরও বলেন,  রিটকারীদের দাবি, সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করে বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালা প্রণয়ন প্রণয়ন করেছিল। অথচ এই বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিধিমালাটি বাতিল ঘোষণা করা হলো।

সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় নিয়ে রায়ে বলা হয়, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্র সচিবালয় রয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের কথা সংবিধান এবং মাসদার হোসেন মামলায় রায়ে উল্লেখ থাকলেও আজ পর্যন্ত হয়নি। স্বতন্ত্র সচিবালয় না করা সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি। বিচার বিভাগ ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিপন্থি কোনো আইন সংসদ প্রণয়ন করতে পারে না। যদি এমন আইন করা হয়, তবে তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।

পর্যবেক্ষনে বলা হয়েছে, সংবিধানের কোনো বিধানকে যখন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়, তখন পূর্ববর্তী বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত বা পুনর্বহাল হয়ে যায়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলা, ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবিধানিক মামলার রায়ে এই দৃষ্টান্ত রয়েছে।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com