তারপর ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর পর যখন রোমান সাম্রাজ্য মিসর দখল করে, তখন মিসর তাদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং মেরোই রাজ্যের অর্থনীতি দুর্বল হতে শুরু করে। নীল উপত্যকার অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে মেরোই রাজ্যের পতন ঘটে।
মেরোই রাজ্যের অর্থনীতি : প্রাচীন মেরোই রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত ভাস্কর্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে জানা যায়, এ রাজ্যের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। এখানকার উর্বর জমিতে ভুট্টা, আঙুর, তুলা ও খেজুরের চাষ হতো, যা জনগণের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কৃষির পাশাপাশি গবাদি পশুপালনও ছিল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেরোইবাসীরা গরু, ছাগল ও ঘোড়া পালন করত, বিশেষ করে ঘোড়া তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত মূল্যবান, যুদ্ধে সৈন্যদের সজ্জিত করা এবং বিদেশে রপ্তানির জন্য তারা ঘোড়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিত। পশুপালন থেকে তারা দুধসহ অন্যান্য উপকরণ লাভ করত, আর মাছ ধরা ছিল তাদের জীবিকার আরেকটি উৎস।
মেরোই রাজ্যের শিল্প : শিল্পকলার ক্ষেত্রেও মেরোই ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বিশেষ করে তাদের মৃৎশিল্প ছিল সুপরিচিত ও নান্দনিক। তারা মাটির পাত্রে পশু, মানুষ এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা অঙ্কন করে সেগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলত। এই মৃৎশিল্পে মূলত দুই ধরনের শৈলী লক্ষ করা যায়। নারীরা বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করত; যেমন—নানা আকৃতির কলস তৈরি। অন্যদিকে পুরুষরা কুমারের চাকার সাহায্যে পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করত। মৃৎশিল্প উৎপাদনের জন্য তারা চুল্লি নির্মাণ করেছিল, যা তাদের কারিগরি দক্ষতার পরিচয় বহন করে। এ ছাড়া মেরোইবাসীরা শিলা থেকে লোহা নিষ্কাশনের কৌশল আয়ত্ত করেছিল, যা তাদের শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।
মেরোইদের খনি ও কারিগরি দক্ষতা : প্রাচীন মেরোইয়ের অধিবাসীরা খনি ও ধাতু প্রযুক্তিতে অসাধারণ দক্ষতার জন্য সুপরিচিত ছিল। তাদের ব্যবহৃত খনি প্রযুক্তি সে সময়ে বিশ্বের অন্যতম উন্নত বলে বিবেচিত হতো। এর প্রমাণ মেলে বিশাল চুল্লিগুলোর অস্তিত্বে, যেখানে তারা লোহা গলিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করত।
তারা অস্ত্রশস্ত্র, ছুরি, কুঠার, কৃষি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে অলংকারত্ন যেমন—নূপুর, কানের দুল ও বালাত্ম নির্মাণে পারদর্শী ছিল। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনের জন্য চামচ, কাঁচি, এমনকি অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামও তারা তৈরি করত। এসব নিদর্শন তাদের উন্নত কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে।
মেরোইদের সামরিক ব্যবস্থা : রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সময়কাল ছিল যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতে পরিপূর্ণ। তবু শক্তিশালী সেনাবাহিনীর দক্ষ নেতৃত্বের ফলে এই রাজ্য প্রায় হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। মেরোইর অধিবাসীরা নিজেদের অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম নিজেরাই তৈরি করত, যা তাদের সামরিক শক্তিকে আরো দৃঢ় করে তুলেছিল। তারা তাদের যুদ্ধ দেবতা আপেডেমাকের প্রতি গভীর বিশ্বাস পোষণ করত। এই দেবতার উদ্দেশে তারা একটি রাজকীয় মন্দিরও নির্মাণ করেছিল, যেখানে তাকে ধনুক, তলোয়ার ও বর্শা সজ্জিত অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে। এটি তাদের যুদ্ধপ্রবণতা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এক অনন্য সমন্ব্বয়কে তুলে ধরে।
রাজনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি : মেরোইর শাসকরা রাজ্যের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের দক্ষ কারিগর ও পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করতে সচেষ্ট ছিলেন। অস্ত্র, ধ্বংসাত্মক উপকরণ এবং নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জনের জন্য তাঁরা বহিরাগতদের স্বাগত জানাতেন। সে সময়ে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক মূলত রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে এই সম্পর্ক কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ জোটে রূপ নিত, আবার কখনো তা যুদ্ধ ও সংঘর্ষে পরিণত হতো। এই পরিবর্তনশীল সম্পর্কই মেরোই রাজ্যের রাজনৈতিক কৌশল ও কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।