সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ময়মনসিংহের ‘টক’ জিলাপি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

রমজানের বিকেল। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেই ময়মনসিংহ নগরীর প্রধান সড়ক আর মোড়গুলোতে বাড়তে থাকে ব্যস্ততা। ইফতারের টেবিল সাজাতে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ছোটেন রোজাদাররা। ডালের বড়া, ছোলা, বেগুনি, মুড়ি—সব দোকানেই ভিড়।

কিন্তু শুধু জিলাপি কিনতেই যে ভিড়, সেটি আলাদা করে চোখে পড়ে জিলা স্কুল রোড মোড়ের মেহেরবান হোটেলের সামনে। 

এই ভিড় কেবল ক্রেতার সংখ্যা দিয়ে বোঝানো যাবে না। ইফতারের আগে দোকানের সামনে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। অনেক সময় যানজটও তৈরি হয়।

কার আগে কে জিলাপি পাবে, আদৌ পাওয়া যাবে কি না—এই দুশ্চিন্তায় সারি আরো দীর্ঘ হয়। শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ আগেভাগেই এসে দাঁড়ায়। 

কী আছে এই জিলাপিতে : দেখতে একেবারে সাধারণ। রং, আকার—সবই পরিচিত।

কিন্তু মুখে তুললেই চমক। মিষ্টির সঙ্গে মিশে থাকে হালকা টক স্বাদ। স্থানীয় লোকজনের ভাষায় এটি ‘চুক্কা’ জিলাপি। কড়া মিষ্টির ভেতর টকের সূক্ষ্ম ছোঁয়া—এই বৈপরীত্যই যেন তৈরি করেছে আলাদা এক আকর্ষণ। 

নগরীতে অন্য কোথাও এমন স্বাদের জিলাপি দেখা যায় না।

কেউ কেউ বানানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু ক্রেতাদের ভাষ্য—মেহেরবান হোটেলের সেই স্বাদ আর পাওয়া যায়নি। ফলে টক জিলাপি মানেই এই মোড়, এই দোকান। 

এই ব্যতিক্রমী স্বাদের নেপথ্যে আছেন জাকির হোসেন (৫৯)। এখন তিনি দোকানের মূল কারিগর ও তদারককারী। তবে শুরুটা ছিল ভিন্নভাবে।

জাকির হোসেন বলেন, ১৯৯৩ সালের কথা। তখন তিনি এই দোকানেই কর্মচারী। ডালপুরি, শিঙাড়া আর জিলাপি তৈরি হতো নিয়মিত। একদিন ভারি বৃষ্টিতে প্রস্তুত করা জিলাপির খামির পড়ে থাকে অব্যবহৃত। নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

ফেলে না দিয়ে খামিরে মেশানো হয় চালের গুঁড়া, ডালের গুঁড়া আর তেঁতুলের পানি। তৈরি হয় নতুন স্বাদের জিলাপি। প্রথমে নিজেরাই খান। তারপর পরিচিতদের দেন। সবার মুখে একটাই কথা—স্বাদ আলাদা।

সেই পরীক্ষামূলক উদ্যোগই পরে রূপ নেয় ব্যবসায়। ধীরে ধীরে ‘টক জিলাপি’ নামে পরিচিতি পায় পণ্যটি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলছে এর যাত্রা।

রমজান এলেই দোকানে কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সকাল ১১টা থেকে শুরু হয় বিক্রি, চলে ইফতারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত। বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় বলে জানান জাকির হোসেন। বর্তমানে তাঁর দোকানে কাজ করেন ২৪ জন কর্মচারী। রমজানে দুই ছেলেও এসে হাত লাগান।

বর্তমানে সাধারণ টক জিলাপি কেজিপ্রতি ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্পেশাল জিলাপি ৩৬০ টাকা কেজি।

দোকানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, বড় কড়াইয়ে তেলে পাক খাচ্ছে জিলাপি। সোনালি রং ধরতেই তোলা হচ্ছে, ডোবানো হচ্ছে রসে। আর কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ হচ্ছে মানুষের সারি। কর্মচারীদের যেন দম ফেলার সময় নেই।

জাকির হোসেন বলেন, ‘সারা বছরই বানাই। তবে রমজানে চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অনেক বড় ইফতার আয়োজনেও আমাদের জিলাপি যায়।’ তিনি দাবি করেন, কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। মান ঠিক রাখাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

দোকানের সামনে কথা হয় মোতাহার হোসেন মাজেদ নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। স্কুলজীবন থেকেই তিনি এখানে আসেন। ২৭-২৮ বছর ধরে নিয়মিত এই টক জিলাপি কিনছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এই স্বাদ অন্য কোথাও পাই না।’

নূরজাহান নামের আরেক ক্রেতা বলেন, প্রতিবেশীদের মুখে শুনে এসেছেন। ভালো লাগলে আবারও আসবেন।

জিলাপির বাইরে নগরীর ইফতার বাজারেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ডালের বড়া, ছোলা, বেগুনি, আলুর চপ, খেজুর—সবই বিক্রি হচ্ছে জমজমাটভাবে। বড়া প্রতিটি ১০ টাকা, বেগুনি প্রতিটি ১০ টাকা, ছোলা গড়ে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ শাহি হালিমও কেনে।

রমজানে নারী উদ্যোক্তারাও যুক্ত হচ্ছেন এই ইফতার বাজারে। ‘ফ্রেশ কিচেন’-এর কর্ণধার মারিয়া রাদিয়া তুর রহমান জানান, তাঁদের রয়েছে বিশেষ প্যাকেজ। পিঁয়াজু, ছোলা, চপের পাশাপাশি বিরিয়ানি, খিচুড়ি, তেহারিও সরবরাহ করা হয়। বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে।

নাজনীন খানম বন্যা জানান, তিনি নাটক ঘর এলাকায় প্যান্ডেল করে ইফতারসামগ্রী বিক্রি করছেন। বাসায় তৈরি মানসম্মত খাবার বিক্রির পাশাপাশি রয়েছে হোম ডেলিভারির সুবিধাও।

ইফতারের টেবিলে প্রতিদিনই নতুন কিছু যোগ হয়। তবু ময়মনসিংহে টক জিলাপির আবেদন আলাদা। রমজানের বিকেলে জিলা স্কুল রোড মোড়ে দাঁড়ালে বোঝা যায়—একটি খাবারের স্বাদ কিভাবে একটি শহরের ঐতিহ্যে রূপ নেয়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com